ঢাকা, বাংলাদেশ  |  বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬



  বিভাগ : পরবাস তারিখ : ৩০-০৮-২০২৫  


ক্লেদজ কুসুম


  আবদুল্লাহ আল-হারুন, জার্মানি



দু’সপ্তাহ আগে বিকেল পাঁচটায় পাশের শহরে হজপিসের একটি আঞ্চলিক সমাবেশের আয়োজন হয়েছিল। আমি যখন (১৯৯৭) হজপিসের কর্মী হিসেবে এ সংগঠনে যোগদান করি সে সময় সদস্য-সদস্যাদের গড় বয়স ছিল পয়ষট্টির কাছকাছি! যে গ্রুপে আমি প্রশিক্ষণ নেই সেখানে আমিই ছিলাম সে সময় সর্বকনিষ্ঠ (৫২)। কর্মীদের মধ্যে মহিলাই ছিলেন শতকরা ৯০-৯৫ জন! বিধবা, নিঃসঙ্গ বা স্বামীর সথে বিচ্ছিন্ন প্রৌঢ়া-বৃদ্ধারা মৃত্যুসঙ্গ দিয়ে হয়ত নিজেদের একাকি জীবনে কিছু কর্মচাঞ্চল্য বোধ করতেন। ইউরোপে অবসর নেওয়ার পর বয়স্ক-প্র্রজন্মটি সমাজের মূল স্রোত থেকে সরে যান বা সরে যেতে বাধ্য হন। এখানে জীবনের মূলমন্ত্র, ‘গাহি যৌবনের গান’! যে কাজ করে না বা পেনশনের টাকায় অবসর জীবন যাপন করে, তাদের দিকে বাঁকা চোখে চেয়ে, যারা এখনও কাজ করছে, তারা ইঙ্গিত করে, ‘তোমরা তো পরগাছার দল’। কথাটা কিছুটা সত্যি, তাদের পেনশনের টাকা যারা এখন কাজ করছেন, তাদের বেতনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ’পেনশন-বীমার’ টাকা থেকেই আসে। এটাই জার্মানির গত শতাব্দীর বিসমার্ক কৃত বিখ্যাত ‘প্রজন্ম-চুক্তি’ (Generation- Vertrag)। যার অধীনে বর্তমান কর্মরত প্রজন্ম, তবে গত প্রজন্মের অবসর জীবন যাপন নিশ্চিত করে। একসময় এরাও পরের প্রজন্মের বাঁকা চোখের শিকার হবে। এটাই নিয়ম। ঢিলটি মারিলে পাটকেলটি..., তবে জেনেও কেউ গা করে না!
পেনশনভোগীদের মধ্যে যারা সুস্থ বা কর্মক্ষম, এদের সংখ্যা মোটেও কম না, তারা হজপিস বা এধরনের অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে, সমাজে যে এখনও তারা ‘প্রয়োজনীয়, পরগাছা নন’, তা প্রমাণ করেন। এ শতকে হজপিসে বেশ কিছু তরুন তরুনীও এসেছে। মৃত্যু সম্পর্কে ধ্যান-ধারনা দিন দিন বদলে যাচ্ছে। এটা নিয়ে আলাপ আলোচনা, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি, টিভি ডকুমেন্টারি, এমন কী ছবিও হচ্ছে। বলা যায়, মৃত্যু-প্রসঙ্গ এখন ইউরাপে ‘সযতনে এড়িয়ে যাবার সনাতন ধারাটির’ ট্যাবু উত্তীর্ণ হয়েছে। মৃত্যু নিয়ে টিভি রেডিওতে নিয়মিত টক শোও হচ্ছে আজকাল। 
আলোচনা শেষ হতে রাত আটটা হয়ে গেল। শনিবারের সন্ধ্যা। তিন-চারজন তরুণ-তরুণী সভা ভঙ্গের পরেই তড়িঘড়ি উঠে গেল। আজ সর্বত্র ডিস্কো নাইট। ভাবখানা, মৃত্যু নিয়ে তো অনেক ভাবনা হলো, এবারে জীবনভোগের পালা! প্রবীণ-প্রবীনারা কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে যুত করে বসে গল্পগুজবে মেতে উঠলেন। আমিও তো এখন তাদেরই দলে। বাড়িতে তো আর কেউ দরজার দিকে তাকিয়ে নেই। নিরম্বু একা বসবাস!
আমিও সবার সাথে গলাবাজি করে তাবত বিশ্বের সমস্যা সমাধানে লেগে গেলাম। রাত দশটা বাজার পর খেয়াল হলো সপ্তাহান্তে বাসের সংখ্যা রাতে কমে যায়। ছোট্ট মফস্বল শহর। কে জানে এখন বাস পাই কি না। না পেলে ঝাড়া দশ কিলোমিটার হাঁটতে হবে! অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে পড়লাম। 
কয়েক মিনিট হাঁটার পরই বাস স্ট্যান্ড। বাসের টাইম একটি লোহার থামে দৃষ্টি সীমায় টানানো থাকে। দূর  থেকেই নজরে এল বিদ্যুতালোকে উদ্ভাসিত বাস স্টপের এক পাশের থামটিতে গা লাগিয়ে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নভেম্বরের রাত। হেমন্ত শেষ, শীত এলো বলে। সকালে-সন্ধ্যায় কুয়াশায় চারিদিক ঝাপসা হয়ে থাকে। ও কেন থামটির সাথে গা সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে, তা বুঝতে পরলাম। গায়ে একটা পাতলা জ্যাকেট, যা দিয়ে এখনকার ঠান্ডাটি ঠেকানো সম্ভব না। থামের উপরেই শেড এবং এর সাথেই একটা ছোট হিটার ফিট করা। মিউনিসিপালিটি থেকে অপেক্ষারত রাতের বাসযাত্রীদের ঠান্ডা থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা। মেয়েটি তার স্বল্প কাপড়ের ঘাটতিটি হিটারে পূরণ করার জন্য থামটিতে গা ঠেসে দাঁড়িয়ে আছে। বেঞ্চে বসে নেই। ওটি হিটার থেকে একটু দূরে। আমার গায়ে মোটা জ্যাকেট। ঠান্ডার বিরুদ্ধে ভালো ব্যবস্থা করেই ঘর থেকে বেরিয়েছি। 
আমি থামের কাছে গিয়ে বললাম, সরে দাঁড়াও প্লিজ, বাসের সময় দেখবো। এখানে শিশু, কিশোর- কিশোরীদের বয়স্করা প্রথম থেকেই তুমি করে বলে। যা আবার পরিচয় নেই এমন তরুণ-তরুণীদের এবং বয়স্কদের বলাটা সখ্ত বেয়াদবি। এর বয়স কোনোমতেই ১৪-১৫র বেশি না। মেয়েটি আমার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, কোথায় যাবে তুমি? সেও বিনা দ্বিধায় আমাকে তুমি বলল। আমি বেশ আশ্চর্যই হলাম। ওর বয়সী কেউ আমাকে প্রথমে তুমি বলে না। শুধুমাত্র শিশুরাই এ নিয়ম মানে না। কিন্তু ওতো শিশু নয়। বুঝলাম কিছু গড়বড় আছে। এ বালিকার ব্যবহারটি আর দশজনের মতো নয়। আমি আমার শহরের নাম নিতেই ও বলল, এখনও চল্লিশ মিনিট আছে বাসের। আমিও ওদিকেই যাবো। তার কথায় স্পষ্ট ইঙ্গিত, ‘আমার থাম থেকে সরার দরকার নেই। তোমার এখানে যা জানার, তাতো জেনেই গেলে।’
এবারে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু শিউরে উঠলাম। চোখে মুখে প্রসাধনের যে চিহ্ন তাতে কোনো যত্ন নেই। মনে হয় সব লেপ্টে আছে। বেশ লম্বা চুল। রং বোঝা যায় না। কবে যে শেষ কেশচর্চা করেছিল, তা বলার কোনোই উপায় নেই। চুলগুলি বেশির ভাগ খড়ির মত উঁচিয়ে আছে। তেল বা শ্যাম্পু কোনোটাই যে এ এলাকায় দীর্ঘদিন পড়ে না, তা সুস্পষ্ট। মুখের চামড়া কোঁচকানো। কিশোরির মত নিষ্পাপ দুটি চোখ। ভ্রু আর পাঁপড়িতে কালো রং। তারপরও চোখের মণিতে শিশুর কৌতুহূলের আনাগোনা। বুঝলাম, মুখে যে তার বয়সের ছাপ তা একান্তই চাপিয়ে দেয়া। প্রসাধনে সৌন্দর্যচর্চা নেই, আছে শিকার ধরার পাঁয়তারা। মেয়েটি নিজের শরীরের প্রতি কোনোই খেয়াল করে না। আরেকজনের দৃষ্টি তার দিকে আকর্ষণ করাই প্রধান কৌশল। এককথায় মেয়েটি বারবণিতা। এ বয়সে? কত হবে ওর বয়স?
আমি বেঞ্চে বসার কিছুক্ষণ পরেও দেখলাম একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে থামটি ছেড়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, ‘আমি কি তোমার পাশে বসতে পারি?’
‘স্বচ্ছন্দ্যে।’ আমি বুঝলাম, ও শুধু বসতেই চাচ্ছে। আমি যে তার মক্কেলদের মধ্যে পড়ি না, তা ও জানে। ওর চাউনিতে শিকারীর মনোযোগ নেই।
‘তোমার নাম কি?’ জিজ্ঞেস করলাম। ‘মারিয়া।’ মানে মেরি, মাতা মেরি। যীশুখৃষ্টের মা। মনে কোথায় যেন একটা ব্যথার খোঁচা! সারা দুনিয়ার ত্রাণকর্তা, মহান যিশুর মায়ের নামে ওর নাম। তিনি তাহলে রাস্তার জীবন থেকে ওকে রক্ষা করেন না কেন? 
‘তোমার নাম কি? তুমি কি এই শহরে থাকো?’ আমার উত্তর শুনে বলল, ‘তুমি কি আমার বাসের টিকিটটি কিনে দেবে? আমার আজও কোনো রোজগার হয়নি। টিকিট ছাড়া অনেক সময় ড্রাইভার বাসে উঠতে দেয় না।’
‘আমার সাথে আজ যদি তোমার দেখা না হতো, তুমি কিভাবে বাসে যেতে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘ড্রাইভার রাজি না হলে বা কোনো যাত্রীর দয়া না হলে, এখানে শহরের মধ্যে গিয়ে কিছু ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতে হতো। তবে এ শহরটা ছোট। সম্ভাবনা কম। কিছুই না হলে, রাতটি কোথাও কাটিয়ে সকালে আবার বাস ধরার চেষ্টা করতাম।’ 
‘থাকো কোথায় তুমি? এ শহরে এসেছো কেন?’
‘আজ দুপুরে একজন এখানে নিয়ে এসেছিল। সন্ধ্যায় বিনা নোটিসে ওর বান্ধবী এসে পড়াতে আমার চলে আসতে হলো।’ আমি বললাম, ‘তোমার বন্ধু তোমাকে কোনো টাকা-পয়সা দেয়নি?’ ‘বন্ধু নয়, ফ্রায়ার (মক্কেল)। শয়তান একটা। বান্ধবী আসার পর আমাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিল। ভান করলো, যেন আমাকে চেনেই না।’ বলে একটা লম্বা হাই তুললো। ‘গত দু’রাত ধরেই ঘুমানোর জায়গা পাচ্ছি না।’ হাই তোলার একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা ওর। ‘তুমি স্কুলে যাও না?’ ‘স্কুলে গিয়ে কী হবে? ঐ সব স্কুল পাশ করে চাকরি করে মাসে যা রোজগার হবে, তা কোনো কোনো সময় আমি এক রাতেই পেয়ে যাই।’ পড়াশুনার বিরুদ্ধে অকাট্য যুক্তি!
‘তোমার বয়স কত?’ ‘সত্যিটা বলব, না, আইডি কার্ডের?’ এতক্ষণে মারিয়া বেশ সহজ হয়ে এসেছে। 
‘দুটিই বলো। ‘সামনের মাসে পনেরয় পড়ব। কিন্তু এই দ্যাখো, আমার কার্ড, উনিশ বছর।’ আমার ধারণাই ঠিক। ‘ফলস-কার্ড কোথায় পেলে?’ ‘আমার এক বন্ধু ছিল, রাশিয়ান। ও করে দিয়েছে।’  
‘তোমার বাবা মা?’ 
‘বাবাকে তো মাই চেনে না, আমি চিনবো কী করে?’  
‘সেকি?’  
‘হ্যাঁ, মা এক উৎসবে সারাদিন মদটদ খেয়ে রাতে কার সাথে জানি শুয়েছিল। ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড। আামি পেটে আসার পর আমার নানী অনেক বলে কয়ে মাকে গর্ভপাত করা থেকে নিবৃত্ত করেছিল। বুড়ি কট্টর ক্যাথলিক। গর্ভপাতকে মহাপাপ মনে করে। আমি হবার পর থেকেই নানীর কাছে থাকি।’ 
‘তোমার নানী এখন কোথায়?’  
‘গতবছর থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টে এক ওল্ডহোমে থাকে। হার্টের শক্ত অসুখ। মনে হয় এবারে ক্রিসমাস (ছয় সপ্তাহ পরেই) বেচারির কপালে নেই।’ 
খুব স্বাভাবিকভাবে কোনোরকম চিন্তাভাবনা না করেই বলল। মনে হলো, মৃত্যুভয়কে সে কোনো হজপিস-প্রশিক্ষণ ছাড়াই জয় করে ফেলেছে! 
‘তুমি কোথায় থাকো?’
‘নানির একটা ছোট্ট বাড়ি আছে গ্রামে। ওখানে মাঝে মাঝে বেড়াতে যাই। থাকি এক এক রাত এক একজনের সাথে। এ শহর ও শহরে। মাঝে মাঝে আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশানেও রাত কাটাই। সব রাতই তো আর সমান না!’ বলে হেসে ফেলল। ও নিজেও জানে না, ওর এসব কথার মধ্যে অনেক গভীরতাও আছে। কোনো লেখক এটা লিখলে নতুন দর্শনও হয়ে যেত হয়ত! 
‘নানীকে দেখতে যাও না?’
‘প্রতি সপ্তাহে একবার যাই। মনে হয় শিগগিরই এ যাতায়াতটিও বন্ধ হয়ে যাবে।’  
‘তোমার মা কোথায়?’
‘দু বছর হলো বার্লিনে থাকে।’
‘কী করে?’ 
এক মুহূর্তও না থেমে বলল, ‘বেশ্যাবৃত্তি!’ আরও বললো, ‘মাই তো আমাকে শিখিয়েছে, স্কুলে গিয়ে সময় নষ্ট না করে সরাসরি রাস্তায় নেমে টাকা কামাতে। মায়ের সাথেই তো আমি প্রথম এই রাস্তায় নামি।’ 
বুুঝলাম, তাকে এ বিদ্যাদানটি তার মাই করেছেন। সংসার করেনি। বিয়ে,স্বামী বা প্রেম, ও নিজেও জানে না। সন্তান-স্নেহ, মাতৃত্ব তার কাছে অজ্ঞাত। মেয়েকেও তাই তারই পথে নিয়ে এসেছে।
বললাম, ‘এভাবই কি সারাটা জীবন কাটাবে?’ 
‘জানি না,’ বলে চুপ করে গেল। পরিবেশটা বেশ থমথমে হয়ে গেল। ১৫/২০ মিনিট ধরে আলোচনার স্বচ্ছন্দ্য ধারাটি আমার এ প্রশ্নে যেন কোন বাঁধে আটকে গেল। দেখলাম, মুখে একটু বিষণ্নতা। কী একটা চিন্তা করছে। ২/৩ মিনিট পরে বলল, ‘কিছু টাকা জমাবো। তারপর গ্রামে নানীর বাড়িতে গিয়ে থাকবো। বুড়ী আমাকে লিখে দিয়েছে। বাগানে শাকসবজির চাষ করবো। নানীর কাছে এসব শিখেছি। একটা গাই পুষবো। টাটকা দুধ খাওয়া যাবে।’ বলে খিল খিল করে হেসে ওঠলো। বুঝলাম, স্বপ্ন দেখার অধিকার আন্তর্জাতিক ও সর্বজনীন। বিশ্বের সর্বত্র এর উপস্থিতি। কোনো ভূগোল বা ইতিহাস দিয়ে এর সীমারেখা টানা যায় না। বর্ণ, ধর্ম, দেশ-কাল-পাত্রের উর্ধে স্বপ্নের পরিসীমা। বললাম, ‘শুধু শাকসবজির চাষ আর গরুর দুধ খেয়ে কি জীবন কাটানো যায়?’ মনে হলো একটু হোঁচট খেল! ওর এই একান্ত স্বপ্নটিতে যে এতবড় একটা ফাঁক আছে তা সে হয়ত কোনোদিন ভাবেনি। ‘বলা যায় না, হয়ত একটা পেশা শিখবো ‘কি পেশা?’ 
‘কিন্ডারগার্ডেনে টিচার বা কোনো শিশুসদনে বাচ্চাদের কেয়ার টেকারের। আমার সাথে ফ্রাঙ্কফুর্টের একজন সমাজকর্মীর ভালো পরিচয় আছে। ও বলে, আমি চাইলে তিনবছর একটা স্কুলে পড়ে এবং পরে একবছর শিক্ষানবিষী করে বাচ্চাদের দেখাশুনার পেশায় ঢুকতে পারবো। কয়েকবছর পরে ওদের টিচারও হতে পারবো।’ ওর নানীর গ্রামের বাড়ি ফ্রাঙ্কফুর্টের পাশেই। ও এ শহরেই বেশির ভাগ থাকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি তো ফ্রাঙ্কফুর্টে থাকো। এখন আমার শহরে যাচ্ছো কেন?’  
‘যাবার ইচ্ছা তো ফ্রাঙ্কফুর্টেই ছিল। কিন্তু এত লম্বা রাস্তা বাসে বা ট্রামে বিনাভাড়ায় যাওয়ার খুব অসুবিধা। তোমার শহরে মিউনিসিপালিটি ভবনের নিচে গাড়ি রাখার জায়গায় কোনোমতে রাতটা কাটিয়ে সকালে দেখি ফ্রাঙ্কফুর্ট যাওয়া যায় কি না। কপাল ভালো থাকলে হয়ত কোনো গাড়ির দরজা খোলা পাবো। তাহলে রাতটা ভালো কাটবে।’ বলেই আবার সেই শিশুর মত হাসি! পরে আমাকে অবাক করে বলল, ‘তোমার সাথে আলাপ করার পর আজ রাতে আর মক্কেল ধরতে ইচ্ছা করছে না। আজ রাতটা বিশ্রাম নেবো। আজ আমার ছুটি।’ বলেই হো হো করে হেসে উঠলো। বাস এসে গেলো। আমি বললাম, যাও উঠে সিটে বসো। আমি দুজনের টিকেট কিনে আসছি। হাসিমুখে ধন্যবাদ বলে সে বাসে গিয়ে পেছনের একটা জায়গায় বসলো। বাসে দু-একজন মাত্র যাত্রী। 
আমি ওর কাছে গিয়ে পাশে বসে ওর হাতে টিকেট দিয়ে বললাম, ‘এটা ফ্রাঙ্কফুর্টের টিকেট। ড্রাইভার বললো, এ বাসটি সোজা সুদ-বানহোফে যাবে। ওখান থেকে এস-বানে তুমি ফ্রাঙ্কফুর্টে রাত এগারোটার মধ্যে পৌঁছে যাবে। তারপর ইচ্ছা হলে এ টিকেট দিয়েই বাসে তোমার নানীর বাড়ি যেতে পারবে। ড্রাইভার বলেছে রাত বারোটা পর্যন্ত ওখানকার বাস আছে। এই নাও ছয় ইউরো, ফ্রাঙ্কফুর্টে সামান্য কিছু খেয়ে নিও।’ সবমিলিয়ে দশ ইউরোর মত লাগল আমার। আমি নিজেও খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। থাকলে হয়ত আরো কিছু দিতে পারতাম। সারাজীবনই আমার ইচ্ছার সাথে সঙ্গতির বিরোধ! মারিয়ার অবাক হওয়া দৃষ্টিতে বিরাট এক শূন্যতা। মনে হলো আমার কোনো কথাই সে শুনেনি। সে আবার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু চোখের চাউনিতে রাজ্যের অবিশ্বাস। তাকে কেউ এমনিতে কোনো টাকা পয়সা দেয় না। পিতৃস্নেহ কী তা সে জানে না। এক নানী আদর করত। সেও এখন মৃত্যুশয্যায়! মা সুদূর বার্লিনে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত।
বাস ছেড়ে দেবার পর আস্তে আস্তে বলল, আমি তো শুধু তোমার শহর পর্যন্ত টিকেট চেয়েছিলাম। তোমার এতগুলি টাকা খরচ হলো। আমি হয়ত পরে তোমাকে ফেরত দিতে পারবো। কিন্তু আমি তো জানি না তুমি কোথায় থাকো। আমি বললাম, আমি কোথায় থাকি তা তোমার জানার দরকার নেই। তবে পৃথিবী এখন খুবই ছোট। আবার হয়ত পথিমধ্যে কোথাও তোমার সাথে দেখা হবে। তোমার নানীর বাড়িতে শাকসবজির চাষ শুরু করে গরু কেনার পর, যখন তুমি বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য একটা পেশা শিখবে, সেদিনই আমার এ সামান্য টাকাটা পুরো সুদসহ শোধ হয়ে যাবে। ভালো থাকার চেষ্টা কর। বেস্ট অব লাক। টেক কেয়ার। আবার দেখা হবে।

নয়ে ইজেনবুর্গ, জার্মানি


 নিউজটি পড়া হয়েছে ৪১২ বার  






 

পরবাস

 
স্টকহোম ক্লাবের দশ বছর পূর্তি পালিত হলো জাঁকজমকভাবে

 
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে

 
মেকং ডেল্টা

 
ওয়ার মিউজিয়াম: মার্কিন নৃশংসতার দলিল

 
নবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানে

 
সায়গনের ১২১ কিলোমিটার লম্বা চুচি টানেল

 
হিউ ভিয়েতনাম ও হোচিমিনের জন্মস্থান

 
ভিয়েতনামের ট্র্যাজিক মাইলাই ও শান্ত হোইআন

 
হ্যালংবে

 
ভিয়েতনাম: দ্যা ল্যান্ড অব ড্রাগন্স

পরবাস বিভাগের আরো খবর






 

আমাদের  মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
ঢাকা: পল্টন রিসোর্সফুল সিটি, ৫১/এ পুরানা পল্টন (৪র্থ তলা), ঢাকা-১০০০।
নারায়ণগঞ্জ: ৪৫/৩ মতিন ভিলা, হাজী ব্রাদার্স রোড, জামতলা, নারায়ণগঞ্জ।

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০

 


সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক
আসিফ হাসান নবী

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

 


President of the Editorial Board
Abdullah Al-Harun
Chief Editor
Asif Hasan Nabi

Editor & Publisher
Md. Ziaul Haque
Special Correspondent
Robiul Islam Sohel

  Location Map
Copyright © 2012-2026

All rights reserved

concept, design
& developed by

corporate work
 

  info@amadermanchitra.news       amadermanchitrabd@gmail.com