ঢাকা, বাংলাদেশ  |  বৃহস্পতিবার, ৩ এপ্রিল ২০২৫



  বিভাগ : সাহিত্য তারিখ : ২৯-১২-২০২৪  


মধুবাজ: একটি আটপৌরে গল্পের ঠাসবুনন

বই আলোচনা


  মানচিত্র প্রতিবেদন



‘মধুবাজ’ রেদওয়ান খানের লেখা একটি উপন্যাস। চিলেকোঠা পাবলিকেশন থেকে বইটি ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের ‘নক্ষত্রের খোঁজে’ প্রতিযোগিতায় এটি ছিল নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

‘মধুবাজ’ নামের মধ্যেই একটি নতুনত্ব আছে। পাখিরা ফুলের মধু খায়, কিন্তু মৌমাছি ভরা মৌচাক ভেঙে পাখিরা মধু খায়- এমনটি কিন্তু সচরাচর শোনা বা দেখা যায় না। অথচ মধুবাজ নামের ব্যতিক্রমী এই পাখিটি মৌচাক ভেঙে মধু খেতে অসাধারণ দক্ষ। লেখক পুরো লেখার মধ্যে এই নামের প্রতি কতটুকু সুবিচার করেছেন সেটা বিবেচ্য বিষয়। একজন পাঠকের কাছে নামটি শুনে মনে হবে এটা কোনো হালকা প্রেমের উপন্যাস, যেখানে প্রেম, শারীরিক সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব, ঈর্ষাসহ সাধারণ কোনো গতানুগতিক বিষয় আছে। কিন্তু উপন্যাস পড়া শুরু করে যতই এর গভীরে যাওয়া যাবে ততই একজন সিরিয়াস পাঠকের কৌতূহল বাড়তে থাকবে।

উপন্যাসের মূল চরিত্র রঞ্জন আহমেদ উচ্চশিক্ষার্থে বিলাত যাওয়ার পরে নিজেকে কখনও ভাবেন পরিযায়ী, আবার কখনও উদ্বাস্ত। এই অদ্ভুত দ্যোতনায় তিনি নিজেই ক্ষতবিক্ষত। তিনি বিলাতে পড়তে যান দেশে তার স্ত্রী মঞ্জুলিকা, কন্যা সুরঞ্জনা আর মাকে রেখে। সঙ্গতকারণে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাপোষা একজন আপাত বেকার যখন বিপুল ধারদেনা করে বিলাতে যান তখন যতটা না থাকে ডিগ্রি নেয়ার চিন্তা তারচেয়ে বেশি থকে অর্থউপার্জনের বিষয়। আপাতদৃষ্টিতে এটা মূখ্য কারণ হলেও ঘটনার গভীরে গেলে বোঝা যায় আসলে রঞ্জন পালাতে চেয়েছে তার যাপিত জীবনের এক দুঃসহ আবহ থেকে। স্ত্রীর সাথে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তাকে অনেকটাই একধরনের বন্দিত্ব আর অসহায়ত্বে আটকে রেখেছিল। আজীবন অন্তর্মুখী রঞ্জন এই যন্ত্রণা থেকে সরে আসতে চেয়েছে। বাবা, মা বা ভাইয়ের প্রতি রঞ্জনের দুর্বলতা মঞ্জুলিকাকে সন্দেহপ্রবণ করে তুলেছিল। দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত রূপ পায় যখন রঞ্জনের ছোট ভাই রিফাত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার বাসায় আসে এবং মঞ্জুলিকার নেতিবাচক আচরণ প্রত্যক্ষ করে। রঞ্জনের তখন মনে হয় সে যেন মঞ্জুলিকাকে চিনতে পারছে না। স্ত্রীর এই আচরণে রঞ্জন কষ্ট পায় কিন্তু অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে কাউকে কিছু বলতেও পারে না।

আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারে কেউ বউ হয়ে আসার পরে তাদের মধ্যে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা আর তথাকথিত ঈর্ষা ভর করে। স্বামীকে নিজের মতো করে সম্পূর্ণভাবে পেতে চায় বলে সংসারে আর কারো প্রতি স্বামীর বেশিমাত্রায় দুর্বলতা সে সহ্য করতে পারে না। অথচ এই বউরা বুঝতে চায় না স্ত্রী ছাড়াও একজন স্বামীর সংসারে আরো অনেকে আছে যাদেরকে বাদ দিয়ে তারপক্ষে চলা সম্ভব নয়। এইসব টানাপোড়েনের অনিবার্য পরিণতি দাঁড়ায় আলাদা হয়ে যাওয়া অথবা বিচ্ছেদ।

জীবনসঙ্গীর সম্পর্ক আসলে থাকে আলমারিতে তোলা কাপড়ের মতো। কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে থাকে ভালোবাসা। ভাঁজ নষ্ট হলে ভালোবাসায় ভাটা পড়ে। এই ভাঁজে যখন আঁচড় লাগে তখন শুরু হয় দ্বন্দ্ব। খুব কম দম্পতি আছে যারা এই সব কিছু মেনে বুঝে, মানিয়ে চলতে পারে। খুব কম দম্পতি সুরে সুর মিলিয়ে-তালে তাল মিলিয়ে পথ চলছে। সন্তানের দিকে তাকিয়ে সংসার টিকে থাকলেও তাতে থাকে না কোনো মানসিক নৈকট্য বা সুখের কোনো ছিটেফোটা আবেশ। এই মানসিক যন্ত্রনা নিয়েই পার হয় আমাদের যাপিত জীবন।

মঞ্জুলিকার চরিত্রও একধরনের জটিল জটাজালে আকীর্ণ। সে তার পিতার সংসারে মায়ের অবহেলা আর বাবার ঔদাসিনতায় ছোটবেলা থেকেই অন্তর্মুখী আর অসহায়। স্বামীর সংসারে এসে সম্পূর্ণভাবে তাকে পেতে গিয়ে স্বামীর আর কারো প্রতি ভালোবাসাকে মেনে নিতে পারেনি। কেউ কাউকে বুঝতে পারে না। আসলে আমরা সবাই এই জটিল মনস্তÍাত্ত্বিক জ্যামিতিক রেখায় আটকে থাকি। মঞ্জুলিকার মতো অনেকেই বুঝতে চায় না, পৃথিবীতে প্রতিটি জীবনই আলাদা। প্রতিটি প্রাণী আলাদা, প্রতিটি পাখি আলাদা, প্রতিটা পিঁপড়াও আলাদা। একইভাবে প্রতিটি মানুষও ভিন্ন। সবার মনস্তত্ত্বও এক নয়। তাই সবার ক্ষেত্রে যে একই ব্যাপার খাটবে, তা নয়।

কাহিনিতে দেখা যায় রঞ্জন বিলাতে এসেও সেই মানসিক এক কঠিন জটিল গোলকধাঁধাঁয় আটকে আছে। একদিকে স্ত্রী, সন্তান আর মায়ের প্রতি টান, অপরদিকে টিকে থাকার জন্য দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম ও একধরনের অনিশ্চয়তা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবারের দোকানে দাঁড়িয়ে কাজ করতে গিয়ে যখন দেহে অবসাদ ও ক্লান্তি ভর করে তখনও সে স্বপ্ন দেখে বউ আর বাচ্চাকে নিয়ে আসবে লন্ডনে। তার অবচেতন মন সুখের এক অন্য জগতের আবেশ দেখে। কিন্তু সেখানেও সে হোঁচট খায়। দুই দুই বার মঞ্জুলিকার ভিসার আবেদন বাতিল হয়। রঞ্জন ভেঙ্গে গিয়েও যায় না, কারণ সে এই জটিল সময়ের সাথে আগেই পরিচিত। তাইতো বার্সালোনাতে বেড়াতে গিয়ে স্বল্প পরিচয়ের দেশী বান্ধবী ঝুম্পাকে অবলীলায় বলতে পারে, ‘হ্যাপিনেসের সো কলড ড্রিম আমাদের রিয়েল লাইফকে একধরনের ইল্যুশনে চুবিয়ে রেখেছে’।

প্রচন্ড আবেগ আর কঠিন মনোবল রঞ্জনের বৈশিষ্ট্য। পাঠকের প্রত্যাশা ছিল শেষপর্যন্ত রঞ্জন কী করবে বা কই যাবে সেটা জানার? লেখক তার কোনো সমাপ্তি টানেননি। পাঠককে একটা ঘোরের মধ্যে রেখেই কাহিনি শেষ করেছেন, যাতে একজন পাঠক নিজের মতো করেই রঞ্জনের পরিণতি আঁকতে পারেন। প্রবাস জীবনের কঠোর পরিশ্রম আর বাস্তবতার আলোকে রঞ্জনকে দাঁড় করিয়েছেন সময়ের আবহে। আমরা সবাই এরকম জটিল এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে নিয়তই খাবি খাচ্ছি।

লন্ডনের যাপিত জীবনের বর্ণনা এককথায় অপূর্ব। এই শহরের দিন ও রাতের বিবরণ দারুণ মুন্সিয়ানায় লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। এই শহরকে বলা হয় বিশ্ব নাগরিকের শহর। ফলে এখানে জীবনযাত্রার মধ্যেও থাকে একধরনের বৈচিত্র্য। এসব বিচিত্র চরিত্রের মোহনীয় বর্ণনা করা হয়েছে অত্যন্ত নির্মোহভাবে। কাহিনির প্রয়োজনে যে নামগুলো এসেছে সবাই একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র। প্রত্যেকেরই আছে বিচিত্রধরনের যাপিত জীবনের আখ্যান। রঞ্জন যেই বাসায় সাবলেট থাকে সেই বাসায় মনোয়ার নামের মধ্যবয়সি একজন দেশ থেকে সাজিয়া নামের এক কিশোরী মেয়েকে বিয়ে করে আনে। কয়েকদিন পরেই সেই কিশোরী বধুকে যখন কাজে যায় না বলে মনোয়ার নির্মমভাবে পিটায় তখন তার বিলাপে মনে হয় বাংলাদেশের প্রতিটি কিশোরীই যেন চিৎকার করছে। লন্ডন-আমেরিকাপ্রবাসী ছেলের কাছে মেয়ে গছিয়ে দিয়ে বাবা-মা ভাবেন জাতে উঠেছেন। কিন্তু প্রদীপের নিচেই যে কত অন্ধকার থাকে তা আমরা অনেকেই জানি না। যখন দেখি এই মনোয়ার লন্ডনের বিখ্যাত বেশ্যাপাড়া বলে খ্যাত ‘সহো’র অফিসিয়াল সদস্য তখন দেশের সকল অসহায় বাবা-মা আর কন্যাদের করুণ মুখই ভেসে ওঠে। কারণ কন্যাদায়গ্রস্থ বাব-মা লন্ডন-আমেরিকায় সেটেলড ছেলে পেলে খোঁজ নেয়ারও চেষ্টা করেন না, ছেলেটি সেখানে কী করে? যদিও সবাই হয়ত এরকম নয়।

লেখক দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিলেন বলে এত নির্মোহভাবে বলতে পেরেছেন। কাহিনির ঠাসবুনন এবং উপস্থাপনা পাঠককে তৃপ্তি দেবে নিঃসন্দেহে। কাহিনির প্রয়োজনে সংলাপকে কখনও নিয়েছেন খিস্তিপর্যায়ে। তবে সেটা আরোপিত মনে হয়নি। আমার কাছে মনে হয়েছে এটি একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস। কারণ উত্তম পুরষে লেখায় রঞ্জনের যে আর্তি আর অসহায়ত্ব ফুটে ওঠেছে তাতে মনে হয়েছে আমরা সবাই কম-বেশি একেকজন রঞ্জন হয়ে প্রতিনিয়ত যাপিত জীবনে অভিনয় করে যাচ্ছি।

একশত ছিয়াত্তর পৃষ্ঠার বইয়ে প্রচ্ছদ, কাগজের মান ছাপা থেকে শুরু করে সবকিছু খুব উন্নতমানের। কিছু কিছু বানান বিভ্রাট পাঠকের মনযোগে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, তবে সম্পাদনার মান ভালো।

বইটির সার্বিক প্রচারণা ও সাফল্য কামনা করি।


আসিফ হাসান, ঢাকা।


 নিউজটি পড়া হয়েছে ১৬১ বার  






 

সাহিত্য

‘জার্মানির যত সূর্যকন্যা: হিলডেগার্ড ফন বিঙ্গেন থেকে ফ্রেডেরিকে অটো’

একগুচ্ছ কবিতা

শিক্ষা

কথা দিলাম

জাকিয়া রহমানের কবিতা: সমাজ ও সমকালের দর্পণ

জাকিয়া রহমানের একগুচ্ছ কবিতা

বিটবুর্গ রহস্য-৩

বিটবুর্গ রহস্য-২

বিটবুর্গ রহস্য-১

আস্ট্রিদের পিপ্পি ও সুইডিশ-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক

সাহিত্য বিভাগের আরো খবর






সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি:
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক:
আসিফ হাসান নবী

সম্পাদক ও প্রকাশক:
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা:
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

আমাদের মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
কক্ষ নং ১৪/সি, নোয়াখালি টাওয়ার (১৪ তলা), ৫৫-বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০
ইমেইল: info@amadermanchitra.news, amadermanchitrabd@gmail.com

Location Map
Copyright © 2012-2025
All rights reserved

design & developed by
corporate work