২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের নারীরা, বিশেষ করে ছাত্রীরা যে অকুতোভয় ভূমিকা পালন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তবে এই লড়াইয়ের একটি অন্ধকার দিক ছিল 'ডিজিটাল সহিংসতা'। সেই আন্দোলন কেবল রাজপথের লড়াই ছিল না, এটি ছিল একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে নারীরা যখন ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে এসেছেন, তখন তাদের দমাতে একদল মানুষ বেছে নিয়েছিল ডিজিটাল মাধ্যমকে। রাজপথের বুলেটের পাশাপাশি নারীদের লড়তে হয়েছে সাইবার জগতের ‘ভার্চুয়াল বুলেটের’ বিরুদ্ধে। রাজপথের আঘাত দৃশ্যমান হলেও ডিজিটাল স্পেসের আঘাতগুলো থাকে আড়ালে। অনেক ছাত্রী আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে তীব্র মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছেন। পরিবারের চাপ এবং সামাজিক লোকলজ্জার ভয় থাকা সত্ত্বেও তারা পিছিয়ে যাননি, যা তাদের সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে একজন নারীকে দমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় মনে করা হয় তার 'সম্মান' বা 'চরিত্র' নিয়ে প্রশ্ন তোলা। আন্দোলন থেকে নারীদের সরিয়ে দিতে এবং অন্য নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ধরাতেই এই সুপরিকল্পিত ডিজিটাল আক্রমণ চালানো হয়েছিল।
ডিজিটাল মাধ্যম আজ আর নিছক যোগাযোগের জায়গা নয়—এটি ক্ষমতা, প্রতিরোধ ও সহিংসতার এক সমান্তরাল যুদ্ধক্ষেত্র। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে এই বাস্তবতা আরও নগ্নভাবে সামনে এসেছে। রাস্তায় পুলিশের লাঠি ও জলকামানের মুখে যেমন আন্দোলনকারীরা দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তেমনই অনলাইনে নারীরা দাঁড়িয়ে পড়েছিল এক অদৃশ্য কিন্তু ভয়ংকর সহিংসতার সামনে।
এই সহিংসতা শুরু হয়নি হঠাৎ করে। বহু বছর ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর কণ্ঠ রুদ্ধ করার একটি সুসংগঠিত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ছাত্র আন্দোলনের সময় সেটি চরম রূপ নেয়। নারী শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট কিংবা কেবল মত প্রকাশকারী—কারও পরিচয়ই রক্ষা পায়নি।
একজন তরুণ সাংবাদিক ফারিহা রহমান (ছদ্মনাম) আন্দোলনের সময় পুলিশের আচরণ নিয়ে একটি ভিডিও শেয়ার করার পর থেকেই আক্রমণের শিকার হন। তার ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে ছড়ানো হয়, পরিবারের ঠিকানা ও ফোন নম্বর প্রকাশ করা হয়। প্রতিদিন শত শত বার্তা—হুমকি, কুরুচিপূর্ণ ভাষা, যৌন ইঙ্গিত। অনলাইনের এই নিরবচ্ছিন্ন হামলা শেষপর্যন্ত তার পেশাগত কাজকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। নিরাপত্তার কারণে তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরে যেতে হয়—যেখানে তিনি এতদিন সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন।
আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মায়া আক্তার (ছদ্মনাম) টুইটারে আন্দোলনের তথ্য শেয়ার করতেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে ভুয়া অভিযোগ ছড়ানো হয়—তিনি নাকি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে যুক্ত। ফেইক অ্যাকাউন্ট দিয়ে চালানো এই প্রচারণার ফলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, পরিবার থেকেও চাপ আসে “চুপ করে থাকার”। শেষ পর্যন্ত তিনিও ডিজিটাল স্পেস থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন।
কিছুদিন আগে কক্সবাজারে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই ডিজিটাল সহিংসতার আরেকটি নগ্ন উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওয়েস্টার্ন পোশাক পরার “অপরাধে” এক নারীকে প্রকাশ্যে কানে ধরে উঠবস করানো হচ্ছে। ভিডিওটির ক্যাপশনে তাকে ‘পতিতা’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়—কোনো প্রমাণ ছাড়াই, কোনো দায় ছাড়াই। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওটি মুহূর্তেই লাখো মানুষের সামনে এক নারীর সম্মানকে জনসমক্ষে নিলাম করে দেয়। এটি কেবল একটি ভিডিও নয়; এটি নারীর শরীর, পোশাক ও স্বাধীনতার ওপর সমাজের তথাকথিত নৈতিক পাহারাদারদের ডিজিটাল লিঞ্চিংয়ের প্রতিচ্ছবি।
এই তালিকায় যুক্ত হয় আরও একটি হাই-প্রোফাইল কেস—ডা. তাসনিম জারা। রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে দেওয়ার পর, বিশেষ করে এনসিপি থেকে সরে এসে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যৌথভাবে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো মাত্রই, তিনি ভয়াবহ অনলাইন আক্রমণের মুখে পড়েন। তার বক্তব্যের বদলে আক্রমণ করা হয় তার ব্যক্তিত্ব, লিঙ্গ ও পরিচয়কে। গালাগালি, চরিত্রহনন, হুমকি—সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিণত হয় এক “ফ্রি ট্রায়াল কোর্টে”, যেখানে প্রমাণ ছাড়াই রায় হয়ে যায়। শুধু তিনি নন, তার পরিবারকেও হেয় করতে ছাড়েনি ট্রল বাহিনি। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয়—বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান নেওয়া মানেই নিজেকে ও পরিবারকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
এই ধরনের ডিজিটাল সহিংসতার প্রভাব কেবল অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নীরবতা, আত্মগোপন, মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাস হারানো—এসবই এর প্রত্যক্ষ ফল। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার সামাজিক সম্মানের ভয়ে ভিকটিমকে চুপ থাকতে বাধ্য করে। এমনকি অতীতে এই অনলাইন নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে—যা আমাদের জন্য একটি ভয়াবহ সতর্ক সংকেত।
এত কিছুর পরও নারীরা দমে যাননি। তারা নিজেরাই সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করেছেন। একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল ঢাল তৈরি করেছেন। গ্রুপ চ্যাট বা সিক্রেট গ্রুপের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।
২০২৪-এর বিপ্লব সফল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রে নারীরা যে ক্ষত বয়ে বেরিয়েছেন, তার বিচার বা স্বীকৃতি এখনো পুরোপুরি আসেনি। একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে ডিজিটাল স্পেসেও নারীদের নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আইন আছে, কিন্তু কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কিংবা সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত বিধানগুলো ভিকটিমবান্ধব নয়। মামলা করতে গেলে প্রক্রিয়া জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং অনেক সময় উল্টো ভিকটিমকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। ফলে অধিকাংশ নারী আইনের আশ্রয় নেন না—নীরবতাই হয়ে ওঠে তাদের আত্মরক্ষার কৌশল।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে যে, স্বাধীনতা কেবল রাজপথ দখল করায় নয়, বরং ডিজিটাল স্পেসেও নিজের মত প্রকাশের নির্ভয় পরিবেশ নিশ্চিত করায় নিহিত। যে নারীরা স্ক্রিনের ওপার থেকে আসা কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ আর হুমকিকে উপেক্ষা করে মিছিলে শামিল হয়েছিলেন, তাদের এই নীরব ত্যাগ যেন নতুন বাংলাদেশের ইতিহাসে হারিয়ে না যায়। ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রের এই ক্ষতগুলো নিরাময় হওয়া জরুরি, যাতে আগামী দিনে আর কোনো নারীকে তার প্রতিবাদের চড়া মূল্য 'চরিত্র' দিয়ে দিতে না হয়।
এই ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রে নারীরা প্রতিদিন লড়াই করছেন—কেউ দৃশ্যমানভাবে, কেউ নীরবে সরে গিয়ে। ছাত্র আন্দোলন আমাদের দেখিয়েছে, অনলাইনে নারীর কণ্ঠ যত শক্তিশালী হয়, আক্রমণ তত নির্মম হয়। প্রশ্ন হলো—এই সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র, প্ল্যাটফর্ম ও সমাজ কি আদৌ প্রস্তুত?
লেখক পরিচিতি:

নাবিলা মারজুক শান্তার জন্ম ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে। ঢাকার AIUB থেকে গ্রাজুয়েশন করেন ২০১৩ সনে। রাশিয়া ও থাইল্যান্ডে Event Management-এ পড়ালেখা করেছেন। রাশিয়ার Tomsk Polytechnic University থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এই লেখক দেশি–বিদেশি প্রেক্ষাপটে মিডিয়া ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ে গভীর দক্ষতা অর্জন করেছেন। হিপ–হপ সংস্কৃতি নিয়ে ডকুমেন্টারি ‘হিপহপ এবং হোপ’ প্রকল্পের জন্য অর্জন করেছেন European Documentary Award এবং Border Beyond Scotland Award—যা তার কাজকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
বাংলাদেশের সম্প্রচার অঙ্গনে গত ১২ বছর ধরে সক্রিয়ভাবে কাজ করা একজন উদ্যমী ও সৃজনশীল নারী প্রযোজক নাবিলা মারজুক শান্তা। চ্যানেল আই, চ্যানেল ২৪, যমুনা টিভি ও নাগরিক টেলিভিশনের মতো শীর্ষ গণমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তাঁর পেশাগত জীবন।#নন্দিনী, যোগফল, শোবিজ টুনাইট, সকালের বাংলাদেশসহ বহু জনপ্রিয় তথ্যবিনোদনমূলক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী অনুষ্ঠান তার সৃজনশীল কাজের স্বাক্ষর।
প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, চ্যালেঞ্জপ্রিয় মনোভাব ও সমাজের অবহেলিত গল্প তুলে ধরার দৃঢ় অঙ্গীকার তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। মিডিয়া ও জার্নালিজম সংশ্লিষ্ট একাধিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি নিরন্তর কাজ করে চলেছেন সত্য, মানবিকতা ও পরিবর্তনের গল্প বলার লক্ষ্যে। ভবিষ্যতে একজন প্রভাবশালী ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করাই তার পথচলার মূল স্বপ্ন।
বর্তমানে সিনিয়র প্রডিউসার হিসেবে কর্মরত আছেন ঢাকার নাগরিক টিভি চ্যানেলে। মিডিয়ার ওপর লেখা তার একটি বই এবং বেশ কিছু গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশসহ বিদেশের পত্রিকায়। তার নির্মিত বেশ কিছু অনুষ্ঠান টিভি দর্শক হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। মিডিয়া জার্নালিজমে বেশ কটি সংগঠনের সাথে যে যুক্ত।
ই-মেইল: nabilamarzuk@gmail.com











