১.
এক দেশে, এক শহরের উপকণ্ঠে একটি বাজারে যাওয়ার পথে পাকা সড়কের ধারে দেখা মেলে চারটি ভিন্নধর্মী সেবাপ্রতিষ্ঠানের।
প্রথমটিতে আছেন একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক। সরকারি চাকরির পাশাপাশি তিনি বেসরকারি একটি হাসপাতালে কর্মরত এবং সন্ধ্যায় নিজের চেম্বারে রোগী দেখেন। সুনাম, জনপ্রিয়তা ও অর্থ—সবই আছে। তবে তার চেম্বারে চিকিৎসা নিতে গেলে খরচও নেহাত কম নয়। তবু রোগীর ভিড়ে অবসর পান না তিনি।

সড়ক ধরে একটু এগোলেই দেখা মেলে স্থানীয় একজন এলএমএফ পাশ চিকিৎসকের। বহু বছর ধরে তিনি এই এলাকায় বসবাস করছেন এবং নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বড় ডিগ্রি নেই, তবে আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তুলনামূলকভাবে কম ফি নেওয়ার কারণে আর্থিকভাবে দুর্বলরা মূলত তার কাছেই আসেন। আবার অনেক সময় সামর্থ্যবানরাও আসেন, বড় ডাক্তারের দেখা না পেলে।

আরও কিছুদূর গেলে চোখে পড়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের চেম্বার। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের আস্থার জায়গা। যারা হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাসী, তারা তিনিই ভরসা। ফি নেন রোগীর আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী—এই মানবিক আচরণ তাঁকে দিয়েছে জনপ্রিয়তার শিখরে। কেউ কেউ বলেন, ব্যালট পেপারে ভোট পড়লে তিনিই নির্বাচিত হতেন!

আরেকটু সামনে, বাজারের মুখে যেখানে জনসমাগম সবসময় থাকে আর বৃষ্টিতে হাঁটু জলে ভেসে যায় পথ—সেখানেই বসেন চতুর্থ সেবাদানকারী। তার পাশে থাকে একটি টিয়া পাখি, আর পাখির সামনে সারি করে রাখা থাকে কুড়ি খানা খাম। প্রতিটি খামের মুখ খোলা। মাত্র ৫ টাকার বিনিময়ে, কেউ তার ভাগ্য, স্বাস্থ্য বা ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে টিয়া পাখিটি পায়চারি করে একটি খাম তুলে মালিকের হাতে দেয়। তিনি খাম খুলে কাগজ বের করে সেটি কাস্টমারের হাতে দেন। কেউ আশাবাদী হন, কেউ হতাশ হয়ে ফিরে যান। কাগজটি পরে আবার খামে ঢুকে পড়ে পরবর্তী গ্রাহকের অপেক্ষায়।

২. জীবনের চার রূপ
(ক) স্বল্পশিক্ষিত এক ভদ্রলোক, ভাগ্যগুণে আর ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে স্বল্প সময়ে অনেক সম্পদের মালিক হয়েছেন। গাড়ি, বাড়ি, পরিবার—সব মিলিয়ে সুখে দিন কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে পেটে ব্যথা শুরু হয়। স্ত্রী তাকে অনুরোধ করেন পরিচিত স্বনামধন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে, যিনি বাজারের রাস্তায় চেম্বার করেন। কিন্তু ভদ্রলোক বারবার টালবাহানা করেন—শুধু ফি বেশি বলে। একদিন অফিসে ব্যথা বাড়তেই বাড়ে। পথে বাড়ি ফেরার সময় তার চোখ পড়ে ভাগ্য পরীক্ষার সেই টিয়া পাখিওয়ালার উপর। গাড়ি থামিয়ে ৫ টাকা দিয়ে ভাগ্য যাচাই করান। পাখিটি একটি খাম তুলে দেয়, তাতে লেখা: "আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ, চিন্তা মুক্ত হবেন শিগগিরই।" ভদ্রলোক আনন্দে আত্মহারা, আরও ৫ টাকা বখশিশ দিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে দেন। মনে মনে ভাবেন—"ডাক্তারের ফি বাঁচলো আজ!" রাত বাড়তেই ব্যথা তীব্র হয়ে ওঠে। স্ত্রী বাধ্য হয়ে এম্বুল্যান্স ডেকে হাসপাতালে ভর্তি করান। পরদিন সকালে সেই ডাক্তারই উপস্থিত হন, যাঁর কাছে যাওয়ার সাহস করেননি ভদ্রলোক। অপারেশন হয় এপেন্ডিসাইটিসের। মোটা অংকের বিল গুনতে হয়। ভাগ্য পরীক্ষা আর বাস্তবতা—এ যেন এক নির্মম পরিহাস!
(খ) একই এলাকায় বসবাসকারী এক সৎ সরকারি কর্মকর্তা। পরিবারে মিতব্যয়িতা বজায় রেখে চলেন, তবু কিছুটা স্বচ্ছলতা রয়েছে। শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে সিদ্ধান্ত নেন ডাক্তার দেখাবেন। স্ত্রী জানান, কিছু বাড়তি টাকা সঞ্চয় আছে। তাই ভালো চিকিৎসকের শরণ নেওয়া উচিত। অবশেষে ওই স্বনামধন্য ডাক্তারের কাছেই যান। খাদ্যাভাস পরিবর্তনের পর স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। তিনি স্ত্রীর দূরদর্শিতা ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
(গ) একজন সিএনজি চালক, ভাড়াবাসায় একা থাকেন। বাবা ছিলেন সৎ স্কুলশিক্ষক। জীবনযুদ্ধে এখন নিজেই সিএনজি চালিয়ে চলেন। হঠাৎ পিঠে ও পেটে ব্যথা অনুভব করলে চিন্তায় পড়ে যান—ভালো চিকিৎসা দরকার, কিন্তু হাতে টাকা নেই। শেষ পর্যন্ত যান এলএমএফ ডাক্তার সাহেবের কাছে, যিনি সহানুভূতিশীল ও ন্যায্য ফি নেন। ডাক্তার পরামর্শ দেন, নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিশ্রাম, হালকা ব্যায়াম এবং প্রচুর পানি পানের। ওষুধ ছাড়াই ব্যথা সেরে যায় কিছুদিনে।
(ঘ) একজন রিকশাচালক, বস্তিতে বসবাস করেন। সংসারে টানাটানি লেগেই থাকে। তবু ভাগ্য পরীক্ষায় তার কোনো বিশ্বাস নেই। মাথাব্যথা হলে দুদিন বাড়তি রিকশা চালিয়ে কিছু টাকা জোগাড় করেন। ভাগ্য পরীক্ষায় না গিয়ে হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা নেন। দুই দিনেই আরোগ্য লাভ করেন। নিজের প্রজ্ঞার জন্য নিজেকেই ধন্যবাদ জানান।
৩. উপসংহার
ধনী ও গরিব—এই পার্থক্য আমরা সাধারণত অর্থনৈতিক ভিত্তিতে নির্ধারণ করি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কি ধনী মানে শুধু অর্থসম্পদে সমৃদ্ধ? সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটল— তাঁরা অর্থে গরিব হতে পারেন, কিন্তু জ্ঞানে, চিন্তায়, আদর্শে ছিলেন নিঃসন্দেহে ধনী। তাই ইতিহাস তাঁদের গরিব বলেনি কখনও। প্রকৃত ধন-দৌলত নিহিত থাকে আমাদের মন, আত্মা ও চিন্তায়। অর্থের ভার নয়, হৃদয়ের ঔজ্বল্যই মানুষকে ধনী করে তোলে। তাই নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে হীনমন্য না হয়ে, যা আছে তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা শেখা উচিত। সেখানেই খুঁজে পাওয়া যায় প্রকৃত আত্মতৃপ্তি। তখনই নিজেকে ধনী মনে হবে—অন্যথায় নয়। নিজ আত্মাকে না খাইয়ে, না পরিয়ে ও কষ্ট দিয়ে কখনো সুখ পাওয়া যায় না, সুখী হওয়া যায় না।
কামরুল ইসলাম, স্টকহোম: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি নির্বাহী কর্মকর্তা; বর্তমানে শিক্ষক, লেখক, অনুবাদক এবং প্রবন্ধকার











