ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার একটি ঘোষণা প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যে জাতিকে দিয়েছেন। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার এই ঘোষণায় প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের স্বস্তি ফিরে এলেও অস্বস্তিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নানাভাবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার বিষয়ে অপতৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন না হওয়ার বিষয়ে সক্রিয়। এনসিপি’র এক নেতা ইতোমধ্যে বলেছেন ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না। সবমিলিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। এ বিষয় নিয়ে মানচিত্র’র বিশেষ সংবাদদাতা রবিউল ইসলাম সোহেল বিশ্লেষণ করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টা দায়িত্ব নেওয়ার বর্ষপূর্তিতে জানিয়েছেন ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন। সবশেষ মালয়েশিয়া সফরে গিয়েও বলেছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে তিনি সরে যাবেন। একই সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, বিচার ও সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে পুরনো সমস্যা ফিরবে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক চ্যানেল নিউজ এশিয়াকে (সিএনএ) দেয়া টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন তিনি।
এদিকে, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই রাজনীতিতে বিতর্ক চলছে, কোন পদ্ধতিতে হবে নির্বাচন তা নিয়ে। জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কিছু ইসলামী দল পিআর (সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে) পদ্ধতিতে নির্বাচন দাবিতে মাঠে নেমেছে। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি প্রথম থেকেই এ পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিরোধিতা করে আসছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের কথাও বলেছেন। নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে- এ নিয়ে এখনো সরকার বা নির্বাচন কমিশন কিছুই স্পষ্ট করেনি। অথচ পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দাবিতে মাঠ তাতানো শুরু করেছে বেশ কিছু দল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সংস্কার, বিচার, নির্বাচন- এই তিনটি অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীতে এই তিনটি বিষয়ই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে বিতর্ক নেই। তবে সংস্কার ও বিচার চলমান প্রক্রিয়া। সংস্কার চূড়ান্ত বাস্তবায়নে দরকার একটি নির্বাচিত সরকার। আর বিচার চলমান প্রক্রিয়া এবং সময়সাপেক্ষ। নির্বাচনের আগে এই দু’টি বিষয়ের সুরাহা করতে হলে ঘোষিত সময়ে নির্বাচন সম্ভব কি না তা নিয়ে নিয়ে জনমনে সংশয় বাড়ছেই।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, লন্ডন বৈঠকে এটি স্পষ্ট হয়ে যায়। লন্ডনের হোটেল ডরচেস্টারে দুই নেতার বৈঠকটি দেশের রাজনীতির ইতিহাসে মাইলফলক। বলা হয়ে থাকে, এ বৈঠকের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাঁক বদলের সূচনা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ এখনো স্পষ্ট হয়নি তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট দ্বিধা রয়ে গেছে। যতই দিন যাচ্ছে সংশয়ও বাড়ছে। যদিও ইসি শিগগিরই তফসিল দেয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে। ড. ইউনূস সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার ও সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে বাংলাদেশে আবার পুরনো সমস্যাগুলো ফিরে আসবে। তিনি বলেন, আমরা নিজেরা যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলাম, সেগুলো আমরা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছি। আমাদের অঙ্গীকার ছিল গণ-অভ্যুত্থানের সময় জাতির যে আকাক্সক্ষা তা নিশ্চিত করা। এগুলো তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। যদি আমরা নির্বাচন দিয়ে শুরু করি তাহলে আমাদের সংস্কারের প্রয়োজন নেই, বিচারের প্রয়োজন নেই। কারণ, আমাদের পক্ষ থেকে নির্বাচন হলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। তাহলে সবকিছু নির্বাচিতদের হাতে চলে যাবে। কল্পনা করুন, অন্য দু’টি কাজ না করে নির্বাচন হয়েছে। তখন আপনি আবার সেই পুরনো সমস্যায় ফিরে যাবেন।
একইরকম সুরে কথা বলেছেন নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিও। জামায়াতে ইসলামীর সুরও অভিন্ন। কুয়ালালামপুরে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের আগেই এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না। যদি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয়, আমার যে ভাইয়েরা শহীদ হয়েছিল, রক্ত দিয়েছিল সংস্কারের জন্য, তাহলে কবরে গিয়ে তার লাশটা ফেরত দিতে হবে এই সরকারকে। আমার যে ভাইয়ের হাতটা চলে গিয়েছিল, যদি সংস্কার কাজ শেষ না করে নির্বাচন হয়, তাহলে এই সরকারকে আমার ভাইয়ের হাতটা ফিরিয়ে দিতে হবে। যে মায়ের বুক খালি হয়েছিল, ওই মায়ের বুকের সন্তানকে ফেরত দিতে হবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না এই কথা তিনি বলেছেন তা কতোটা তার বলার এখতিয়ার। নির্বাচন কবে হবে বা হবে না, এটা বলা তো সরকারের দায়িত্ব। এনসিপি নেতাদের এ ধরনের বক্তব্যে নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা বেড়েছে বহুগুণ। প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পরও জনমনে প্রশ্ন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে তো! সাধারণ মানুষ নির্বাচন নিয়ে অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলছে। নাসীরুদ্দীনের এমন বক্তব্যে সেই সংশয়কে আরও ঘনীভূত করলো। প্রধান উপদেষ্টা ও এনসিপি নেতাদের বক্তব্য একই সুরে হওয়ায় এ নিয়ে আরও সংশয় বাড়বে বলেই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। বিএনপি’র একাধিক নেতা বলেছেন, আরেকটি স্বৈরাচারের পদধ্বনি দেখতে পাচ্ছেন তারা। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. জাহিদ হোসেন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, কেউ কেউ হুমকি দেন যে, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হতে দেবেন না। মনে হচ্ছে, সেই স্বৈরাচারের যে আচরণ ছিল, সেই স্বৈরাচারের যে কথা ছিল- সেই ধরনের কথার পদধ্বনি আমরা শুনতে পাচ্ছি। বিএনপি’র একাধিক সিনিয়র নেতার প্রতিক্রিয়া একই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সরকারের মেয়াদ কতোদিন? এই সরকারের যত সময় যেতে থাকে তখন তারা কখনো যৌক্তিক সময়ের মধ্যে, কখনো দ্রুততর সময়ের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা বলেছেন। তবে নির্বাচনটা যাতে তাড়াতাড়ি, মানে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন না হয়, তার জন্য বহু ধরনের রাজনৈতিক শক্তি এর মধ্যে সক্রিয় ছিল, এখনো আছে। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন নিয়ে নানা তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে সরকারের মধ্যে। কিন্তু প্রত্যেকটি জায়গায় কথার সঙ্গে কাজের তেমন কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। হতাশাটা আসলে সে কারণেই গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।
সংস্কার ও বিচার সম্পন্ন না করে নির্বাচন হলে দেশ ফের আগের পথেই হাঁটবে- ড. ইউনূসের এ বক্তব্য আমলে নিলে জনমনে নির্বাচন নিয়ে সংশয় বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক। ড. ইউনূস প্রতিশ্রুত সময়ে নির্বাচনের আর মাত্র পাঁচ মাস বাকি। এখনো রোডম্যাপ আসেনি নির্বাচনের, হয়নি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা, কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে তা নিয়ে বিতর্ক চলমান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সূচক ক্রমাগত নিম্নমুখী, চলছে মবোক্রেসি, জুলাই সনদ এখনো চুড়ান্ত হয়নি, সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকেই দুর্নীতিতে জড়িয়ে যাওয়া নিয়েও বিতর্ক চলছে আর এরমধ্যেই চলছে নির্বাচন বিলম্বের নানা আওয়াজ। সার্বিক পরিস্থিতিতে চোখ রাখলে মনে হয়, এ যেনো সরকারের ভেতরে আরেক সরকার কাজ করছে। বলছে একটা- কিন্তু করছে আরেকটা। উল্লিখিত বিষয়গুলো স্পষ্ট করার দায়িত্ব সরকারের। জনমনে সন্দেহ দূর করার দায়িত্ব সরকারের এবং কেবল সরকারেরই। বলাবলি আছে, নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে তৃতীয় পক্ষ ততই সুযোগ নিতে পারে। যা দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।
নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে না হওয়ার জন্য বহু রাজনৈতিক শক্তি সক্রিয়
নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে যাতে না হয় এজন্য বহু রাজনৈতিক শক্তি সক্রিয়। গভর্ন্যান্সের প্রশ্নে সরকারের কোনো কার্যকারিতা আমরা দেখি না বলে মন্তব্য করেছেন সাংবাদিক নূরুল কবীর। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আটজন উপদেষ্টার দুর্নীতির প্রমাণগুলো সমাজের সামনে উপস্থিত করা সেই সাবেক সচিবের নৈতিক দায়িত্ব। তার মতে, ড. ইউনূস ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন দিয়েই একটা সম্মানজনক বিদায় নেওয়ার জন্য আগ্রহী। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করার জন্য যে প্রস্তুতি, তা সরকার সদ্য শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো অতীতে যেভাবে দমন-পীড়ন করেছে, গণ-অভ্যুত্থানের পরে বেশ কয়েক বছর আর করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, অবৈধভাবে চাঁদা দিতে হয়, তাহলে আপনাদের সিট সংখ্যা কমে যাবে। নিউ এজ সম্পাদক বলেন, সংস্কার, বিচার, নির্বাচন নিয়ে তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে; তবে কথার সঙ্গে কাজের তেমন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। সর্বোপরি তিনি বলেন, সরকার-রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের আশা জাগানিয়া কিছু করতে পারছে না।
গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে বাংলাদেশ। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী দেশ গঠনের কাজ চলছে। বিচার-সংস্কার এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। শঙ্কা থাকলেও বেজে গেছে নির্বাচনের ঢোল। আওয়ামী লীগ পরবর্তী কোন দল চালাবে দেশ? কেমন হবে পরিস্থিতি? কতোটা সজ্জিত হচ্ছে নির্বাচনের ট্রেন? কতোটা নিরাপদ হবে যাত্রা?
নূরুল কবীর বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে যে শক্তিসমূহ রাজনৈতিক ন্যায্যতা জুগিয়েছিল পরে যারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) হিসেবে সংগঠিত হয়। ইনডিভিজ্যুয়াল হিসেবে যে তরুণরা গণ-অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে ছিলেন। বিএনপিসহ অপরাপর রাজনৈতিক দল এবং তাদের সমর্থনই, গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রস্তাবেই বর্তমান সরকারের প্রধান নিযুক্ত হন। তিনি পরে অন্যদেরকে তার ক্যাবিনেটে অন্তর্ভুক্ত করেন। এই ঘটনাটা মসৃণভাবে সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী নেতৃত্ব ফ্যাসিলিটেট করেছিল। ফলে এই সরকারের রাজনৈতিক ন্যায্যতার পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলো এবং আমরা জনগণেরও কোনো অংশ, কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে এটার বিরোধিতা করতে দেখি নাই। এই সরকারের একটা সর্বজনীন রাজনৈতিক ন্যায্যতা তৈরি হয়েছিল। তার ভিত্তিতেই এই সরকার তাত্ত্বিক অর্থে প্রতিষ্ঠিত আছে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সরকার তিনটি কাজের কথা বলেছিল। তারা কী করবেন? ১. গণতান্ত্রিক সংস্কার; রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে গভর্ন্যান্স যেটা। ২. এই গণ-অভ্যুত্থানের সময়, বিশেষত যত ধরনের রাষ্ট্রের দিক থেকে, আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে যে খুন-খারাবি হয়েছে, আহত-নিহত হয়েছেন, তাদের, ওই অপরাধীদের বিচার নিষ্পন্ন করা। ৩. এই দুটো কাজ এগিয়ে গেলে, একটা নির্বাচনের মাধ্যমে, যথার্থ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাবেন।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে জনগণের আবেগ-উচ্ছ্বাস এ পর্যন্ত পৌঁছেছিল যে, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোও সেদিন এটা মনে করার বা বোঝানোর কেউ ছিল না যে, এই সরকারের মেয়াদ কতোদিন। মেয়াদের ব্যাপারটা তখন উহ্য থেকে যায়। দিন যত যেতে থাকে, রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতায় যাওয়ার কথা তত মনে পড়ে। তখন তারা নানান পর্যায়ে কখনো যৌক্তিক সময়ের মধ্যে, কখনো দ্রুততর সময়ের মধ্যে এই সমস্ত দাবির প্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা বলেছেন। এই নির্বাচনটা যাতে এত তাড়াতাড়ি, মানে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন না হয়, তার জন্য বহু ধরনের রাজনৈতিক শক্তি এর মধ্যে সক্রিয় ছিল, হয়তো এখনো আছে।
নূরুল কবীর বলেন, কিন্তু সরকারের কতোগুলো গভর্ন্যান্স ফেইলিউরের জন্য সরকারের ভেতরেও যারা বিরোধিতা করতেন তারা বুঝতে পেরেছেন নির্বাচন হয়তো দূরবর্তী পর্যায়ে টেনে নেয়া সম্ভব না। কারণ, কতোগুলো লক্ষণ আমরা দেখি যে, তেমন কোনো কিছুই পরিবর্তন হয় নাই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বরং গভর্ন্যান্সের প্রশ্নে বলছি, সরকারের কোনো কার্যকারিতা আমরা দেখি না। ভয়াবহভাবে অন্যায় এবং অবৈধভাবে চাঁদাবাজি চলছে। প্রায় এই কয়েক মাসে ১০০-এর বেশি লিঞ্চিং-এর ঘটনা ঘটেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড পাবলিকের মধ্যে। সরকারি রাষ্ট্র-প্রশাসন এই ব্যাপারে আওয়ামী লীগ আমলের মতন সেই উত্তেজনা-উৎসাহ তাদের কমেছে। কিন্তু সামাজিকভাবে ল’ অ্যান্ড অর্ডার না থাকবার কারণে এই ধরনের রাস্তাঘাটে পিটিয়ে মারা, মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে মারার ঘটনা অসংখ্য ঘটছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সরকার তুলনামূলকভাবে একটা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল। এর বাইরে এই সমাজের মধ্যে ঘুষ-দুর্নীতি বেড়েছে।
সাবেক সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার আটজন উপদেষ্টার দুর্নীতির কথা বলেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি মনে করি আটজনের কথা বলেছেন যিনি তিন নিজে জাতীয়তাবাদী দলের একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তার মতো মানুষের আবার প্রমাণ ছাড়া ঢালাওভাবে কতোগুলো নাম উচ্চারণ করা ঠিক হয়নি বলে আমি মনে করি। সেই প্রমাণগুলো সমাজের সামনে উপস্থিত করা তার নৈতিক দায়িত্ব। নতুবা আমরা এটা একটা রাজনৈতিক দায়িত্বহীনতা হিসেবে দেখবো।
তিনি বলেন, গভর্ন্যান্সের দিক থেকে কোনো গুণগত উত্তরণ সংঘটিত হয়নি। এজন্য যারা অতি উৎসাহী ছিল যে, এই সরকারকে আরও প্রলম্বিত করে, সরকারের ভেতরে যারা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে চান, তাদের উৎসাহে কিছুটা ভাটা পড়েছে। ড. ইউনূস ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন দিয়েই একটা সম্মানজনক বিদায় নেওয়ার জন্য আগ্রহী আছেন বলে আমার ধারণা।
রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি, তারা আরও সময় পেলে তাদের দুটো উপকার হতো বলে তারা বিশ্বাস করতেন। একটা হচ্ছে, বিএনপি’র রাজনৈতিক দল হিসেবে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে কিছু উদ্যোগ এবং নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও, সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা যে অন্যায় চাঁদাবাজি, জবরদখলের মধ্যে গেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর, রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু সেই ক্ষতিগুলোতে জামায়াত এবং বিএনপি’র যারা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, নেক্সট নির্বাচনে যাদেরকে দেখা যাবে। তারা উচ্চবাচ্য করলেও মনে মনে তারা খুশি ছিলেন। কারণ বিএনপি যত অজনপ্রিয় হবে, তাদের আসন সংখ্যা তত বৃদ্ধি পাবে। এই ধারণা থেকে এবং আরও নিজেদেরকে সংগঠিত করার সময় পাবেন। এই দু’টি রাজনৈতিক সংগঠন তাদের এরকম একটা আকাক্সক্ষা বরাবরই ছিল এবং থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।
নির্বাচনটাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য সরকারের যে ধরনের ব্যাপক প্রস্তুতি থাকা দরকার, সেই প্রস্তুতি তারা সদ্য শুরু করেছেন বলে মনে হয়। বিচার প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক দল এবং সংগঠন হিসেবে রাষ্ট্রীয় তৎপরতার নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের ওপর। যদি ১৫ই আগস্ট উপলক্ষে তারা কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করে, সেটা বেআইনি হিসেবে সম্ভবত প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বাংলাদেশ বারবার নানা ধরনের বড় বড় সংগ্রামে আত্মাহুতি দানের মধ্যদিয়ে একটা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার দিকে যেতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি মনে করে কয়েকজন মিলেমিশে তাদের সংগঠিত শক্তি রয়েছে বলেই সেগুলোকে ইগনোর করতে পারবে, আমি মনে করি তাহলে তাদের ইতিহাসবোধের দিক থেকে হীনতা আছে। হয়তো আমরা এই পর্যায়ে একটা সত্যিকার অর্থে ইস্যুগুলো নিয়ে আলাপ করলাম, একটা গুণগত গণতান্ত্রিক সংস্কার পরিপূর্ণভাবে আমরা করতে পারবো না। কিন্তু তাদের বোঝা দরকার যে, এই ধরনের গণ-অভ্যুত্থানের পরে তারা ইচ্ছা করলেই অতীতে যেভাবে সরকার চালিয়েছেন, বিরোধী দলগুলোর মতামত উপেক্ষা করে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, ভিন্নমতকে দমন করবার ক্ষেত্রে যেই পদ্ধতি বিভিন্ন মাত্রায় অতীতের রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করেছে, অবলম্বন করেছে, সেগুলো তাদের পক্ষে বেশ কয়েক বছর আর করা সম্ভব হবে না। সুতরাং তাদের নিজেদেরকে, নিজেদের দলকে এবং নিজেদের মন এবং মননকে, মননের ভেতরে একটু গণতান্ত্রিক সংস্কার আনয়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অবৈধ চাঁদা আদায় করে বৈধ ভোট আশা করা ঠিক নয়। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে এখন ক্রিয়াশীল যে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক-আদর্শিক বিভ্রান্তির মধ্যে ঘুরপাক খাওয়ার যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেটা দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। ওই দলটির জন্যও কল্যাণকর নয়। সরকারের মধ্যেও নানা তৎপরতা, উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিশেষ করে সংস্কার ও বিচার। এমনকি নির্বাচন নিয়ে। কিন্তু প্রত্যেকটা জায়গায় কথার সঙ্গে কাজের তেমন কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকার-রাজনৈতিক দল, যারা আসলে দেশ পরিচালনার সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত; যাদের উপরে মানুষের আস্থা রাখতে হয়। তারা কোনোভাবেই মানুষের মধ্যে আশা জাগানিয়া কিছু করতে পারছে না। হতাশাটা আসলে সে কারণেই গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। যে কারণে মানুষ কাকে ভোট দেবে আর কাকে ভোট দেবে না সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে যাচ্ছে। এটাও দেশের জন্য কোনো অবস্থাতেই শুভ লক্ষণ নয়।
নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা!
প্রতিদিনই রাজনৈতিক ঘটনা পরিবর্তিত হচ্ছে। হিসাব-নিকাশে নানা ধরনের কাটাছেঁড়া চলছে। এই হিসাব সামনে আসছে তো-ওই হিসাব মিলছে না। রাজনৈতিক হিসাবে মেলানো সব সময় কঠিন। কারণ রাজনীতিতে শুরু-শেষ বলে কিছুই নেই। তবে এখন আলোচনা অনেকটাই আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে ঘিরে। তবে অন্য সময়ের মতো প্রার্থিতা নিয়ে নয়, বরং মৌলিক প্রশ্ন- নির্বাচন আদৌ হবে কিনা, হলে কেমন হবে? নির্বাচন কি ইনক্লুসিভ হবে? ভোটাররা কি নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন? কারা কারা জোট করবে? কারা কারা অংশ নেবে? নির্বাচনকেন্দ্রিক গোপন আসন ভাগবাটোয়ারার আভাস এবং কথনও কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। সবকিছু মিলে নির্বাচন নিয়ে চলছে এক ধরনের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সংশয়-সন্দেহের নানা অনুষঙ্গ।
দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই নির্বাচন বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনেক উপদেষ্টাই প্রথমদিকে ক্ষেপে যেতেন। বলতেন, তারা নির্বাচন দেওয়ার জন্য আসেননি। তারা এসেছেন সংস্কার করতে। সংস্কার করতে যত সময় লাগে ততদিনই তারা থাকবেন। এর বেশি নয়। তখন মনে হতো নির্বাচন অনেকটাই যেন দূরের বিষয়। কবে নির্বাচন হবে কেউ জানে না। যদিও গত এক বছরে মোটা দাগের কোনো সংস্কারই হয়নি। কিন্তু হালের অগ্রগতি- গত ছয় মাস থেকেই জাতীয় নির্বাচনের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে সেনাপ্রধান গণমাধ?্যমে একাধিকবার বলেছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধে?্যই নির্বাচন হওয়া উচিত। বিএনপিসহ বেশকিছু দল ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনের দাবি জানিয়ে এসেছিল।
কিন্তু নির্বাচন প্রশ্নে সরকার কখনও ২০২৬ সালের জুন, ফেব্রুয়ারি, কখনও এপ্রিল- এভাবেই বলে আসছিলেন। আবার তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলার পর বাংলাদেশে ফিরে প্রধান উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা বলেছেন। কিন্তু এর পর পরই আবার ফেব্রুয়ারি থেকে হঠাৎ করেই প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের তারিখ এপ্রিলে নিয়ে গেলে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে থাকে। এমনকি তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে আদৌ নির্বাচন সম্ভব কিনা সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন।
সর্বশেষ নির্বাচন বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয় ৫ আগস্ট। সেদিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন হবে বলে আশ্বাস দেন। সেই ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনও ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আয়োজনের অংশ হিসেবে নির্বাচনের দুই মাস আগে নির্বাচন-সূচি ঘোষণার কথা বলেছে। বেশ কয়েক মাস ধরেই দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসা বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দল এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে প্রধান উপদেষ্টার এই ঘোষণাকে প্রথমে স্বাগত জানায়নি জামায়াতে ইসলাম এবং এনসিপি। জামায়াত বলছে, পিআরপি ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশে এখনই নির্বাচন করার পরিবেশ নেই। যদিও পরে জামায়াতও ফেব্রুয়ারির ভোট নিয়ে তাদের অনাপত্তির কথা বলেছে। কিংস পার্টি হিসেবে পরিচিত থাকা নতুন দল এনসিপি বলছে, জুলাই সনদকে বাস্তবায়ন এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের আগে তারা কোনো নির্বাচনে যাবে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে যে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে না বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
এখন এতসব যদি-কিন্তুর তালে যে বিষয়টি ঘটেছে তা হলো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন। তাই সরকারের নির্বাচনের আশ্বাসেও সত্যিকারভাবে আশ্বস্ত হতে পারছে না জনগণ। কাক্সিক্ষত নির্বাচন আসলেই হবে কিনা সেই বিষয়ে কিছুটা সংশয় তো থাকছেই। এখন সবার মনেই কমবেশি প্রশ্ন নির্বাচন কি সত্যিই হবে? মজার বিষয় হলো এই যে, আগে যখন জনগণ নির্বাচন চাইত বা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করত তখন সরকার নির্বাচনে আগ্রহী ছিল না। বরং তারা এটি শুনলে বিরক্ত হতো। আর এখন সরকার নির্বাচনের মাস নির্ধারণ করেছে, খুব দ্রুতই হয়তো তারিখ ঘোষণা করবে কিন্তু জনগণ বিশ্বাস করছে না যে নির্বাচন হবে। তারা আরও সন্দেহ করছে নির্বাচন হলেও হয়তো সেটি তাদের কাক্সিক্ষত নির্বাচন হবে না।
বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু এবং নিরাপদে ভোট দেওয়ার পরিবেশের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া একটি নির্বাচন চায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সেটি আর বাংলাদেশে হয়নি। পরবর্তী তিনটি নির্বাচনই একতরফা হয়েছে, যেখানে জনগণ ভোট প্রদানের মতো নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাই হয়তো এবারের নির্বাচন নিয়ে তাদের আগ্রহ বেশি ছিল। কিন্তু এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও তাদের সেই আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটবে না বলেই অনেকে মনে করছেন। কিন্তু কেন? কারণও নিশ্চয়ই আছে। ইতোমধ্যেই এই নির্বাচনে আসন বাটোয়ারা নিয়ে আড়ালের আলাপ এবং নিক্তির ওঠানামা অনেকটাই যেন এখন জনকানে পৌঁছাতে সময় লাগে না। আসন ভাগাভাগি হলে সেটি তো আসলে আর কাক্সিক্ষত নির্বাচন হবে না? তাই সরকারের নির্বাচনের আয়োজনে মোটেই জনগণ আশ্বস্ত হতে পারছে না। এ রকমই যদি নির্বাচন হবে তা হলে এই অভ্যুত্থান কেন? সবকিছু যদি আগের মতোই চলবে তা হলে সংস্কারের ঢোল এত জোরে বাজল কেন? তা হলে এই সরকারের কাছেও জনমতের কোনো মূল্য নেই?
অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ আবার জোর গলায় বলছেন, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না, কারণ সরকার ইতোমধ্যেই তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। যেমন বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান এই সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, এই সরকারের পক্ষে একটি ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। সরকারের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতার অভাব, কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা এবং সমর্থন এবং ইনক্লুসিভ নির্বাচন আয়োজনের সমন্বয়- সব মিলেই সরকারের প্রতি এই সংশয়। কারণ ইতোমধ্যেই সরকারের কোনো দলের প্রতি সমর্থন, অনুভূতি কেমন তা বিভিন্ন ঘটনায় স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়েছে। তা হলে কি এই সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে? এবং এটি হলে সেটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না- এই বক্তব্য সামনে আসাটা হয়তো বেখাপ্পা নয়।
একটি অভ্যুত্থানের পর, সব দিক থেকে সমর্থন পাওয়ার পরও কেন জন-আস্থা তৈরি করতে পারল না অন্তর্বর্তী সরকার? সরকারের ওপর আস্থাহীনতার হয়তো একটি বড় কারণ সরকারের কথার সঙ্গে কাজ মিলছে না। সরকার জনমুখী না থেকে কোনো দল বা গোষ্ঠীমুখী অবস্থান তৈরি করেছে। যার কারণে কারও বিপক্ষে অ্যাকশনে নামছে আবার কারও বিপক্ষে চুপ থাকছে। আর এভাবেই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সরকার না হয়েও সরকার ‘রাজনৈতিক’ সরকার হয়ে উঠছে। আর এ কারণেই হয়তো সরকারের কোনো ধরনের আশ্বাস কিংবা সিদ্ধান্তকে জনগণ আমলে নিতে পারছে না। এই অনাস্থা এবং জনগণের অভিমত আমলে না নিতে পারার ব্যর্থতার দায়ও সরকারের। কারণ সরকারকে মনে রাখতে হবে, জনগণের কাছে আস্থাহীন হয়ে নির্বাচনের আয়োজনে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ নাও করতে পারে। আর যদি সত্যিই আওয়ামী লীগের মতো ভাগবাটোয়ারার নির্বাচন হয় তা হলে কি সেটি জনগণ মেনে নেবে? এর পরের প্রশ্ন হলো যদি জনমনের আশঙ্কা সত্যি হয় অর্থাৎ নির্বাচন না হয়, তা হলে কী হবে? চারদিকে-সামাজিক মাধ্যম বাজারে নানা গুজব। এই হবে-ওই হবে, জনমনে ভীষণ আতঙ্ক। আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশ কীভাবে পার করবে? হয়তো নির্বাচনের রোডম্যাপ দেওয়ার পর সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে নির্বাচন নিয়ে। আর তা না হলে নির্বাচনের জন্য আবারও লড়াই করতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশে বর্তমানে যে ধরনের অবস্থা বিরাজ করছে তাতে অতিদ্রুত একটি নির্বাচন অবশ্যই দরকার। তবে নির্বাচনটি হতে হবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এর বাইরে ভাবার অবকাশও খুবই সীমিত। তাই জনগণের আস্থা কাটানোর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করাই হতে পারে সরকারের প্রধান কাজ। সবকিছুর বাইরে গিয়ে সরকারকে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতেই হবে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতেই হবে।
তথ্যসূত্র: প্রিন্টমিডিয়া ও অনলাইন











