ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন নিয়ে এখন পুরো দেশে চলছে আলোচনা। গণমাধ্যমেও ফলাও করে এই নির্বাচনের খবর প্রচারিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উৎসাহ অনেক। যেন আরেকটি জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু কেন?
ডাকসুকে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ হিসেবে বিবেচনা করলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। ডাকসু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে কাজ করেছে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন - সব আন্দোলনেই ডাকসু নেতৃত্ব দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মতে, এখান থেকেই জাতীয় রাজনীতির যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। তাঁরা দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির একটা কারখানা হলো ডাকসু। শুধু রাজনীতি নয়, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং উন্নয়নের ধারায় ডাকসু সবসময়ই সক্রিয় ছিল। তারা ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছে সব সময়। কথা বলেছে শিক্ষা এবং শিক্ষার অধিকার নিয়ে। আর এসব কারণেই ডাকসু এত গুরুত্বপূর্ণ। ৫ আগস্ট বিগত সরকার পতনের পর ডাকসু নির্বাচন হওয়ায় আলোচনাটা আরো একটু বেশি।
সংক্ষেপে ‘ডাকসু’ বলে বহুল পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন ৬ বছর পরে হতে যাচ্ছে আগামী ৯ই সেপ্টেম্বর। এটি একটি সহজ ঘটনা নয়। গত ২৯শে জুলাই নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পরই চঞ্চল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। চঞ্চল না বলে অস্থির বললেই সত্যের কাছাকাছি হয়। এর আঁচ যে ভেতরে ভেতরে দেশের অন্তত বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের অফিসেও লাগেনি তা বলা যায় না। কারণ একদা ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলে গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত এই উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামটি। পাশ্চাত্যের শিক্ষাজগৎ প্রায় ভুলতে বসলেও দেশের অস্থির রাজনীতির ডামাডোলে ডাকসুকে অনেকে ‘দ্বিতীয় পার্লামেন্ট’ বলে আদর করে ডাকে। ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন। ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত প্রায় সমান সমান। শুধু তা দিয়ে নয়, বরং ডাকসুর রাজনৈতিক উত্তাপ এতই বেশি যে, ছ’বছর আগে সর্বশেষ নির্বাচনটি হয়েছিল ২০১৯ সালে; তার আগে ২৯ বছর নির্বাচন হয়নি। এতই গুরুত্বপূর্ণ এই ‘পার্লামেন্ট’!
গত বছর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে দুনিয়া কাঁপানো জেন-জি ছাত্রদের জুলাই অভ্যুত্থানে পনের বছরের একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগকারী শাসকদল আওয়ামী লীগ পতনের মাধ্যমে সূচিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদগুলোর দীর্ঘকাল তামাদি হয়ে থাকা নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আরও আগেই নেয়ার দাবি ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু) ও ১৫ তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু)তে নির্বাচন হবে। এই দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাক্রমে ৩৩ ও ৩৬ বছর পরে নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
তারিখ ঘোষণার পরে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়েই নানা বিষয়ে অস্থিরতা। জাহাঙ্গীরনগরে গত এপ্রিলে একবার তারিখ দিয়ে ‘জুলাই হত্যার বিচার’ প্রশ্নে টানাপড়েনে পিছিয়ে বর্তমান তারিখ দেয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগও কিছু ছাত্র তুলেছিল। রাজশাহীতে ভোটগ্রহণ ছাত্রাবাসের পরিবর্তে একাডেমিক ভবনে হোক দাবি তুলে কয়েকটি ছাত্র সংগঠন অনশন পর্যন্ত করে ফেলেছে। আরও আছে বিভিন্ন নামের গ্রুপের সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকম আক্রমণাত্মক প্রচার বন্ধ করার দাবি ও দোষীদের ভোটাধিকার বাতিল চেয়ে হৈ-হল্লা ইত্যাদি। এ সমস্যা এখন সব ক্যাম্পাসেই আছে। আর প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনগুলো জয়ের নিশ্চয়তার জন্য বিভিন্ন রকম নৈতিক-অনৈতিক কৌশল ভাজতে শুরু করছে। এর বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত ১৫ বছর ছাত্রলীগের একাধিপত্যের যুগে তাদের আনুগত্য করার জন্য ছাত্রদের ওপর নানা রকমের অত্যাচার ঘটতো। যেমন সিট বণ্টনের দায়িত্ব হাউজ টিউটর অফিসের পরিবর্তে ছাত্রনেতারা নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছিলেন এবং অপেক্ষমাণ ছাত্রদের ‘গণরুমে’ রেখে দলীয় সভা-মিছিলে জোর করে নিয়ে যাওয়া, আর্থিক দুর্নীতি এমনকি দৈহিক নির্যাতন পর্যন্ত করার অভিযোগ আছে।
গত বছর আন্দোলনের সময় ১৫ই জুলাই ছাত্রলীগ সন্ত্রাস চালায় ও পরিণামে পরের দিন একজোট হওয়া আন্দোলনকারীদের দ্বারা ছাত্রলীগ বিতাড়িত হয়। এখন রাজনৈতিক দলের অনুসারী ছাত্র সংগঠনের ক্যাম্পাসে, ছাত্রাবাসে কাজ না করতে দেয়ার পক্ষে জনমত আছে। এখন তো ছাত্রলীগ দেশে আইনত নিষিদ্ধ। বলা হয়, ছাত্রাবাসে রাজনীতি করতে দেয়া হলে ভবিষ্যতে বিএনপি অনুসারী ছাত্রদল ও জামায়াত অনুসারী ছাত্রশিবির অতীতের ছাত্রলীগের মতো হয়ে উঠবে, সাধারণ ছাত্রদের ওপর অত্যাচার করবে, ভালোর দিকে পরিবর্তন কিছু হবে না। তবে এই পরিস্থিতি নিয়েও পুরনো রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলো প্যাঁচ খেলে। দেশের মূলধারার রাজনৈতিক নেতারাই তো এখন রাজনীতিকে ‘খেলা’ বলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত যেকোনো ছোট-বড় রাজনৈতিক ঘটনার ভিডিও চিত্র ‘খেলা শুরু হয়ে গেছে’ লিখে পোস্ট দেয়া হচ্ছে। নানাভাবে রাজনীতিতে খারাপ অনুশীলন বাড়ছে, ভালো আচরণের পরিবর্তে। জুলাইয়ে ছাত্রাবাসে সাংগঠনিক রাজনীতি বন্ধ রাখার একটি সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া হয়েছিল। ছাত্রলীগ সরে যাওয়ায় ক্রমশ সেটা ভুলে যাওয়া হচ্ছে। গত ৯ই আগস্ট ১৮টি হলে ছাত্রদল কমিটি গঠন করে ঘোষণা দিলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয়ে গভীর রাতে ছাত্রছাত্রীরা হল থেকে বেরিয়ে আসে, জমায়েত হয়ে ছাত্রদল এমনকি বিএনপি’র শীর্ষ নেতার নামেও অশ্লীল স্লোগান দেয়, দাবি তোলে হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। উপাচার্যকে পর্যন্ত গভীর রাতে ঐ জমায়েতে আসতে হয় পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য। এ ঘটনায় ছাত্রদল পাল্টা ছাত্রশিবিরকে ইঙ্গিত করে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ বন্ধের দাবি জানায়। এর অর্থ হলো ছদ্মবেশে অন্য সংগঠনে ঢুকে কাজ করা। আমরা স্মরণ করতে পারি কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতনের আন্দোলনের পরে উদ্ঘাটিত হয় যে বৈষম্যবিরোধী নামের প্ল্যাটফর্মটির কয়েকজন নেতা দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগ হয়ে কাজ করেছেন। শিবিরের অনেক ক্যাডার ছাত্রলীগের ভেতরে ঢুকে হাতুড়ি-হেলমেট নিয়ে সড়ক আন্দোলনের স্কুলছাত্রদের পিটিয়ে ছাত্রলীগের বদনাম করিয়েছে ইত্যাদি। জুলাই আন্দোলনের শুরুতে মেয়েদের ওপরে হামলায় ছাত্রলীগের অনেক বদনাম হয়েছে। এখানেও ছদ্মবেশী বা গুপ্ত রাজনীতির ভূমিকা থাকার বিষয়ে সন্দেহ আছে। দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র শাসনামলে রাজনীতিতে চাঁদাবাজি-দখলসহ দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগ ওঠে। এখন গুপ্ত রাজনীতির মতো নতুন ঘটনা দেখা যাচ্ছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার কতো শত রাষ্ট্রীয় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। ছাত্রদলের হল কমিটি থাকবে এবং ঢাবি কর্তৃপক্ষ ছাত্রাবাসে ‘গঠনমূলক ছাত্র রাজনীতির রূপরেখা’ সুপারিশের জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। উচ্চশিক্ষার দুর্দশার মধ্যে প্রফেসররা একটি নতুন কাজ পেলেন।
বিশ্লেষকদের মতে সার্বিক পটভূমিতে এই যে ডাকসু-রাকসু নির্বাচন হচ্ছে তা যাতে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির ফাঁদে পড়ে ভণ্ডুল না হয়ে যায় সেজন্য তথাকথিত ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রেও সংস্কারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগুনো উচিৎ। সামপ্রতিক বছরগুলোতে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সেই ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এদেশের ছাত্র রাজনীতির গৌরবের স্মৃতিতে বুঁদ থেকে কেউই বুঝতেই পারেনি যে, ছাত্র রাজনীতি রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে অনেক আগেই পচে গেছে। তখন ছিল ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতি নয়। এত দীর্ঘ সময় যে ডাকসু নির্বাচন হয়নি তার জন্য দায়ী দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। তারা নিজেদের স্বার্থে ছাত্রদের লাঠিয়াল বানিয়েছে। ছাত্ররা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদের মাধ্যমে নিজেদের নেতৃত্বগুণ বিকাশের সুযোগ হারিয়ে বিনষ্টি অর্জন করেছে। আমাদের নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ প্রতি বছর নির্বাচনসহ এর মৌলিক লক্ষ্যে ফিরুক এবং দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হোক। ১৮ বছরের বেশি বয়সী ছাত্ররা রাজনীতি করতে পারে মৌলিক অধিকার হিসেবেই, তবে সেটা করুক রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে, সংঘবদ্ধভাবে রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল হয়ে নয়। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র ব্রিগেড গঠন করুক, তা ক্যাম্পাসে সীমিত দলীয় প্রচার করতে পারবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে, কিন্তু সংগঠনের নামে ক্যাম্পাসে মারামারি-হানাহানি করতে পারবে না।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ৫ প্যানেলে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে বিভিন্ন সংগঠনের ও স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা। প্যানেলগুলোর প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় এখন ক্যাম্পাসে নির্বাচনী আমেজ তৈরি হচ্ছে। তবে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রচার–প্রচারণা এখনো শুরু হয়নি। ২৬ আগস্ট বিকেল চারটায় চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা যাবে ২৫ আগস্টের মধ্যে। ভোটের দিনের (৯ সেপ্টেম্বর) ২৪ ঘণ্টা আগপর্যন্ত প্রচার করা যাবে।
গত ২০শে আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের তৃতীয় তলায় ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেন প্রার্থীরা। বিভিন্ন প্যানেলের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও মনোনয়নপত্র জমা দেন।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শেষে বিকেলে এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, ডাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদের ২৮ পদে মোট ৫০৯টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। যদিও বিভিন্ন পদের জন্য শিক্ষার্থীরা ৬৫৮টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। সেই হিসাবে ১৪৯টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েনি।
তাঁরা জানালেন, অনেক প্যানেল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলেও ডাকসুর শীর্ষ তিন পদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে মূলত পাঁচটি প্যানেলের মধ্যে। এগুলো হলো ছাত্রদল, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ, প্রতিরোধ পর্ষদ, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য এবং ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। কারণ, এসব প্যানেলের কমবেশি নিজস্ব ভোট রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় আন্দোলন–সংগ্রামের অনেক পরিচিত মুখ এসব প্যানেলে রয়েছেন। সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৮টি হল সংসদে ২৩৪টি পদের জন্য ১ হাজার ৪২৭টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ১০৯টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। বাকি ৩১৮টি জমা পড়েনি।
এদিকে প্যানেল ঘোষণা করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ (গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ) এবং অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪ (বামপন্থী তিন সংগঠনের যৌথ প্যানেল)। এর আগে প্যানেল ঘোষণা করেছিল প্রতিরোধ পর্ষদ (বামপন্থী সাত ছাত্রসংগঠনের যৌথ প্যানেল), ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট (ইসলামী ছাত্রশিবির), ডিইউ ফার্স্ট (মাহিন সরকার নেতৃত্বাধীন স্বতন্ত্র প্যানেল), ডাকসু ফর চেঞ্জ, ভোট ফর চেঞ্জ (ছাত্র অধিকার পরিষদ), ছাত্র ফেডারেশন, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন এবং সম্মিলিত ছাত্র ঐক্য (স্বতন্ত্র প্যানেল)। প্যানেল ছাড়াও অনেকে ডাকসুর বিভিন্ন পদে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র কিনেছেন। তাঁদের মধ্যে সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী হওয়া জুলিয়াস সিজার তালুকদারকে নিয়ে ক্যাম্পাসে আলোচনা আছে। কারণ, তিনি একসময় ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ) নেতা ছিলেন। বিভিন্ন পক্ষ তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের দাবি তুললেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর প্রার্থিতা বহাল রেখেছে।
এ ছাড়া ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া সানজিদা আহমেদ তন্বীকে সমর্থন জানিয়ে নিজেদের প্যানেলে এই পদে প্রার্থী রাখেনি ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ, বামপন্থী তিন সংগঠন, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় আহত হয়েছিলেন সানজিদা। তাঁর রক্তাক্ত ছবি অভ্যুত্থানের অন্যতম আইকনিক ছবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
ছাত্ররা গণমাধ্যমকে জানালো, অনেক প্যানেল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলেও ডাকসুর শীর্ষ তিন পদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে মূলত পাঁচটি প্যানেলের মধ্যে। এগুলো হলো ছাত্রদল, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ, প্রতিরোধ পর্ষদ, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য এবং ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। কারণ, এসব প্যানেলের কমবেশি নিজস্ব ভোট রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় আন্দোলন-সংগ্রামের অনেক পরিচিত মুখ এসব প্যানেলে রয়েছেন।
পাঁচ প্যানেলে যাঁরা প্রার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে প্যানেল ঘোষণার পর সিনেট ভবনে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন ছাত্রদলের প্রার্থীরা। ছাত্রদলের প্যানেলে ভিপি পদে প্রার্থী মো. আবিদুল ইসলাম খান। তিনি সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে শেখ তানভীর বারী হামিম ও এজিএস (সহসাধারণ সম্পাদক) পদে তানভীর আল হাদী মায়েদকে মনোনয়ন দিয়েছে ছাত্রদল। হামিম ছাত্রদলের কবি জসীমউদ্দীন হল শাখার আহ্বায়ক আর তানভীর বিজয় একাত্তর হল শাখার আহ্বায়ক।
বিকেলে মনোনয়নপত্র জমা দেন গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ-সমর্থিত বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের প্রার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে তাঁরা প্যানেল ঘোষণা করেন। এই প্যানেলে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরকে ভিপি ও আরেক সমন্বয়ক মো. আবু বাকের মজুমদারকে জিএস প্রার্থী করা হয়েছে। কাদের গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আর বাকের কেন্দ্রীয় আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন। এই প্যানেল থেকে এজিএস পদে লড়বেন আশরেফা খাতুন। তিনি ছাত্রসংসদের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র।
বৈষম্যবিরোধীদের পর সিনেট ভবনে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যের প্রার্থীরা। এই প্যানেল থেকে ভিপি পদে লড়ছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। জিএস পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন খান মাহমুদুল হাসান, আল সাদী ভূঁইয়া ও মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহি। সাদী ও মাহি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির নেতা। সাদী সমিতির সদ্য সাবেক সভাপতি আর মাহি বর্তমান সভাপতি। এই প্যানেল থেকে এজিএস পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাহেদ আহমেদ।
বামপন্থী সাত ছাত্রসংগঠনের সমর্থিত প্রতিরোধ পর্ষদে ভিপি পদে প্রার্থী করেছে শেখ তাসনিম আফরোজকে। তিনি ২০১৯ সালের নির্বাচনে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্যানেল দিয়ে শামসুন নাহার হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। এই প্যানেলের জিএস প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু। আর এজিএস পদে প্রার্থী করা হয়েছে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেলকে।
স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যের প্যানেল থেকে ভিপি পদে লড়ছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। জিএস পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন খান মাহমুদুল হাসান, আল সাদী ভূঁইয়া ও মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহি।
শিবির–সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী মো. আবু সাদিক কায়েম। তিনি সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক। এই প্যানেল থেকে জিএস পদে শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদকে প্রার্থী করা হয়েছে। এজিএস পদে শিবিরের প্রার্থী সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি মহিউদ্দিন খান।
গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ-সমর্থিত বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের প্যানেলে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরকে ভিপি ও আরেক সমন্বয়ক মো. আবু বাকের মজুমদারকে জিএস প্রার্থী করা হয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে ডাকসু নির্বাচন
আবাসিক হল, একাডেমিক ভবনসহ ক্যাম্পাসের আড্ডাস্থলগুলোতে এখন আলোচনার প্রধান বিষয় ডাকসু নির্বাচন। বিভিন্ন আলোচনায় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রম নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রার্থীদের ভূমিকার বিষয়টিও আলোচিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাঁরা আওয়ামী লীগ শাসনামলের মতো গণরুম-গেস্টরুমের সংস্কৃতিতে আর ফিরতে চান না। তাঁরা ছাত্র সংসদে এমন নেতৃত্ব চান, যাঁরা শিক্ষার্থীদের সমস্যা-সংকট নিয়ে কাজ করবেন। এ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কিছুটা এগিয়ে রাখছেন শিক্ষার্থীরা। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক প্যানেলগুলোর স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থীরাও থাকছেন শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায়।
বামপন্থী সাত ছাত্রসংগঠনের সমর্থিত প্রতিরোধ পর্ষদে ভিপি পদে প্রার্থী করেছে শেখ তাসনিম আফরোজকে। তিনি ২০১৯ সালের নির্বাচনে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্যানেল দিয়ে শামসুন নাহার হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। এই প্যানেলের জিএস প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু। হলগুলোতে সরেজমিনে দেখা গেল, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু না হলেও হলের দোকান, পাঠকক্ষ ও ক্যানটিনে গিয়ে প্রার্থীদের অনেকে নিজেদের পক্ষে শিক্ষার্থীদের সমর্থন চাইছেন, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এস এম রাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘এবার একক প্যানেল কোনোটিই জিতবে না। ব্যক্তি ইমেজ, কাজের দক্ষতা দেখেই ভোট দেব। কোনো প্রার্থী আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা সেটি গ্রহণ করবেন না। আবাসিক হলে গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি আর ফিরবে না, এমন প্রতিশ্রুতি যাঁরা দেবেন, শিক্ষার্থীরা তাঁদেরকেই বেছে নেবেন।’
শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাঁরা আওয়ামী লীগ শাসনামলের মতো গণরুম-গেস্টরুমের সংস্কৃতিতে আর ফিরতে চান না। তাঁরা ছাত্র সংসদে এমন নেতৃত্ব চান, যাঁরা শিক্ষার্থীদের সমস্যা-সংকট নিয়ে কাজ করবেন। এ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কিছুটা এগিয়ে রাখছেন শিক্ষার্থীরা।











