গত ২৭শে জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ঢাকার একটি হোটেলে রোটারি ক্লাব অব ঢাকা, রোটারি ক্লাব অব ঢাকা ধ্রুবতারা, রোটারি ক্লাব অব ঢাকা মেগা সিটি এবং আলো-ভুবন ট্রাস্ট-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “Preventive Measures for Cervical and Breast Cancer in Bangladesh”. শীর্ষক সেমিনার ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ড. ইশতিয়াক এ জামান, কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন একেএম সামছুল হুদা, ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর। এছাড়া রিপসা টিমের সদস্যবৃন্দসহ অন্য রোটারিয়ানগণ উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভায় প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর কি-নোট উপস্থাপন করেন সহকারী কো-অর্ডিনেটর রিপসা টিম এবং আলো-ভূবন ট্রাস্টের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ড. হাসিন অনুপমা আজহারি। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্বে প্রতি দুই মিনিটে একজন মহিলা জরায়ুমুখ ক্যানসারে মারা যান। প্রায় ৭০% ক্ষেত্রে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) জিনোটাইপ ১৬ এবং ১৮-এর কারণে এই সংক্রমণ ঘটে। ইন্টারন্যশনাল অ্যাজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার-এর তথ্য মতে বাংলাদেশে ৫ কোটিরও বেশি মহিলা জরায়ুমুখ ক্যানসার আক্রান্তের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবছর ১০ হাজারেরও বেশি মহিলা এই ক্যানসারে মারা যায়।

অন্যদিকে দেশে প্রতিবছরই স্তন ক্যানসার আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০২০ সালে গ্লোবকন পরিচালিত জরিপে দেখা যায় নানাধরনের ক্যানসারের মধ্যে স্তন ক্যানসারের হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও অনেক বেশি। এই ক্যানসারে মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিবছর নতুন করে প্রায় গড়ে ১৩ হাজার নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয় এবং এরমধ্যে ৬ হাজারেরও বেশি নারীর মৃত্যু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন এবং জরায়ু মুখ ক্যানসার দ্রুত সনাক্ত ও প্রয়োজনীয় সুচিকিৎসা গ্রহণ করলে এ ক্যানসারে আক্রান্ত শতকরা ৯৫ ভাগ রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব। আগে থেকে সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও এখনও অনেকেই সেভাবে অসুখটাকে গুরুত্ব দেন না। আর তাই রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়ে যায়।

উল্লেখ্য যে রোটারি ক্লাব অব ঢাকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রোটারিয়ান মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) খন্দকার বদরুল হাসান এবং তার টিমের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৮২ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে রোটারি ক্লাব অব ঢাকার একটি সমেঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই স্বাক্ষরের মাধ্যমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে একটি cancer detection ইউনিট স্থাপিত হয়, যা- পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে মহাখালীতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৯৪ সালে সেই সেন্টার মহাখালিস্থ জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ও হাসপাতাল নামে পরিচিতি পায়।
এ যাত্রাকে আরও সুদীর্ঘ করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সেইসাথে যদি সকল পাবলিক ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করা যায় তাহলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব।
ড. অনুপম আজহারি আরও বলেন, আলো-ভুবন ট্রাস্টে ২০১৮ সাল থেকে এই কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত এবং সার্ভিক্যাল এবং ব্রেস্ট ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচির জন্য সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত দক্ষ টিম আছে। আলো ভুবন ট্রাস্ট, রোটারি ক্লাব অব ঢাকা ধ্রুবতারা গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় এই কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। একটি ক্যাম্পে ৭০ থেকে ১০০ মহিলার স্ক্রিনিংয়ের জন্য প্রায় ৩৭,৬৯০ টাকা প্রয়োজন। নওগাঁয়ে আলো-ভুবন ট্রাস্টের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রহিমা বনিজ হেলথ কেয়ার সেন্টার (আরবিএইচসি) ক্যানসার প্রতিরোধে নিয়মিত সচেতন কর্মসূচি গ্রহণ গ্রহণ করে। সেখানে ক্যানসার সনাক্তকরণের জন্য একটি ম্যামোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিনসহ ব্রেস্ট ইলাস্টোগ্রাফি মেশিন প্রয়োজন। তিনি রোটারি ক্লাবসমূহকে এসব যন্ত্রপাতি সংগ্রহের জন্য সহায়তার অনুরোধ জানান।
এছাড়া তিনি ক্যানসার সচেতনতা কর্মসূচিতে রোটারি ক্লাবগুলোর কৌশলগত অংশীদারত্ব, প্রতি ক্লাবে বছরে ১০-১৫টি ডোজ স্পনসর করারও অনুরোধ জানান। তারমতে এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ২ কোটি ৫০ লক্ষ লক্ষ্যবস্তু নারীদের সুরক্ষা দিবে। তিনি টিকাকরণ+SBE(Self Breast Examination) সার্ভিকাল স্ক্রিনিং অথবা শুধুমাত্র স্ক্রিনিং SBE+সার্ভিকাল স্ক্রিনিং কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হতে রোটারি ক্লাবগুলোর প্রতি আবেদন রাখেন। এছাড়া ডা. অনুপম আজাহারী সেমিনারের গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে সকল রোটারি ক্লাবকে আলো ভূবন ট্রাস্টের ক্যানসার প্রতিরোধ কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার উদাত্ত আহবান জানান।
কি-নোট পেপার উপস্থাপনের পর অতিথিবৃন্দ উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। প্রায় সবাই এই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটক্যালস-এর নির্বাহী, মেডিক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডা. শাকি আজাদ এইচপিভি ভ্যাকসিনের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেন।
প্রধান অতিথি ড. ইশতিয়াক এ জামান সকল রোটারিয়ানকে একই ছাতার নিচে বসে ক্যানসার প্রতিরোধ কর্মসূচি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার আহবান জানান। তিনি এই কর্মসূচি আরও বেগবান করতে অর্থ সংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রোটারিয়ান রফিকুল ইসলাম রাওলি। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আলো-ভূবন ট্রাস্ট-এর উপদেষ্টা আসিফ হাসান নবী।
সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রোটারিয়ান হাসান আহমেদ চৌধুরী।



