রবিউল ইসলাম সোহেল: হঠাৎ এমন ধরপাকড় শুরু হলো কেন? গত কয়েকদিনে শোবিজ জগতের পরিচিত মুখদের গোমর ফাঁস, তাদেরকে আটক নিয়ে সকলের মনে একধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। পর্ণগ্রাফি মামলায় মুম্বাইয়ে শিল্পা শেঠির জামাই রাজ কুন্দ্রার গ্রেফতারের ধরণ নিয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মহলও সাম্প্রতিক ঘটনায় একধরনের যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন। পার্থক্যটা হলো রাজকুন্দ্রা স্পর্শকাতর ছবি দিয়ে কাউকে ব্ল্যাকমেইল করেননি, শুধু পর্ন ছবি তৈরি করে বিশেষ আ্যপের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। আর বাংলাদেশের আটককৃতরা স্পর্শকাতর ছবি তুলে ভুক্তভোগীদের ব্ল্যাকমেইল করতেন।
গতকাল বুধবার ঢালিউডের বহুল আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমনির বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করেছে র্যাব (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) এর একটি দল। পরীমনিকে আটকের পর র্যাব সদস্যরা জানান, অভিযানে তার বাসা থেকে মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে বলা হচ্ছিল, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে চিত্রনায়িকা পরীমনির বাসায় অভিযান চলছে। কি সেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয় ব্যাপক জল্পনা। মূলধারার গণমাধ্যম বিভিন্ন সূত্রে জানিয়েছে, পরীমনি ও তার পরিচিত কয়েক জনের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পরীমনির বাসার পর রাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার চলচ্চিত্র প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজের বনানীর বাসায় র্যাব অভিযান পরিচালনা করেছে। সূত্র জানায়, রাজের বাসায় একটি রুম পাওয়া যায়। যেখানে একাধিক নারী-পুরুষ একসঙ্গে বিকৃত যৌনাচারে ব্যবহার্য সরঞ্জামাদি সজ্জিত ছিল। এটি নজরুল ইসলাম রাজের ‘রাজ মাল্টিমিডিয়া প্রোডাকশন হাউস’র একটি কক্ষ বা বিশেষ বিছানা। এই বাসাতে পর্নো ভিডিও বানানো হতো বলেও জানা গেছে।
এর আগে চিত্রনায়িকা পরীমনিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত সাড়ে ৮টায় বনানীতে রাজের বাসায় অভিযানে যায় র্যাব। টানা দুই ঘণ্টার অভিযান শেষে রাত ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে তাকে আটক করেন র্যাবের সদস্যরা। গুলশানকেন্দ্রিক এ চক্রের আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম রাজ। প্রযোজক হিসেবে তার কিছুটা পরিচিতি রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে তার পেশা করপোরেট কোম্পানির বড় কর্তাদের সঙ্গে ভিন্ন উদ্দেশ্যে উদীয়মান মডেলদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বিনিময়ে কমিশন পান তিনি। এ জগতের আরও দু'জন- নাজিম সরকার ও তুহিন কাজী। তাদের ব্যাপারেও গোয়েন্দা অনুসন্ধান চলছে। ঢাকা ছাড়াও গাজীপুরকেন্দ্রিক তাদের চক্র সক্রিয়।সবমিলিয়ে অনেকেই তাই প্রশ্ন করছেন, বলিউডের সাথে পাল্লা দিয়ে ঢালিউডের তারকাদেরও কি ধরা হচ্ছে পর্নোগ্রাফির মামলায়?
যারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন তাদের অধিকাংশের বাস রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে খ্যাত গুলশান-বনানী ও বারিধারায়। তাদের সখ্য যাদের সঙ্গে, তারাও সমাজের উঁচু স্তরের ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। হেলেনা জাহাঙ্গীর, ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা, মরিয়ম আক্তার মৌ গ্রেপ্তারের ধারাবাহিকতায় গতকাল গ্রেপ্তার হলেন অভিনেত্রী পরীমণি। এ ছাড়া বিতর্কিত মডেলদের সহযোগী হিসেবে শরফুল হাসান ওরফে মিশু হাসান ও মাসুদুল ইসলাম ওরফে জিসানকে গতকাল গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কেন আকস্মিকভাবে এসব গ্রেপ্তার- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল নেপথ্য কাহিনি। সংবাদসূত্রগুলোর তথ্যমতে, মডেলদের কেউ কেউ পার্টির আড়ালে গোপন ক্যামেরায় সমাজের বিত্তশালীদের অসতর্ক মুহূর্তের ছবি এবং ভিডিও তুলে রাখতেন। এর পরই এই ছবি তাদের পরিবারের স্বজন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর ভয় দেখিয়ে বিত্তশালীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করতেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ চক্রের সদস্যদের এজেন্ট রয়েছে। তারা সেখান থেকে সুন্দরী মেয়েদের নানা প্রলোভন দিয়ে ঢাকায় আনতেন। এরপর তাদের মাধ্যমে অভিজাত এলাকার পার্টি গার্ল হিসেবে ব্যবহার করতেন। অনেককে মডেল বানানো, নাটক-সিনেমায় কাজ করার টোপ দেওয়া হতো।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দায়িত্বশীল সূত্র বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানায়, বেসরকারি একটি ব্যাংকের এমডি সম্প্রতি মডেল পিয়াসা ও মৌয়ের চক্করে পড়েন। তার অসতর্ক অবস্থার ছবিকে পুঁজি করে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এদের চক্কর থেকে বের হতে ওই ব্যাংকের এমডি বিষয়টি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে জানিয়ে আইনি প্রতিকার চান। এরপর বেরিয়ে আসে; শুধু ওই ব্যাংকের এমডি নন, এখন পর্যন্ত পিয়াসা ও মৌয়ের মোবাইল ফোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১৭টি ভিডিও পাওয়া গেছে। এসব ভিডিওতে কয়েকজন শিল্পপতি-ব্যবসায়ীর বখে যাওয়া সন্তানদের অসতর্ক মুহূর্তের ছবি রয়েছে। তাই এসব গোপন ভিডিও অন্যদের হাতে চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। চক্রটির প্রতারণা থেকে ফেঁসে যাওয়া ব্যক্তিদের বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষার জন্য এ অভিযান।
ব্যাংকের এমডির সূত্র ধরে বিত্তশালীদের ফাঁসানোর বিষয় জানার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গভীরভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এসব অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে সবুজ সংকেত মেলার পর গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেপ্তার তালিকায় আরও ৩৫ থেকে ৪০ জন রয়েছেন। মূলত অসতর্ক মুহূর্তের ছবি ব্যবহার করে ফাঁসানোর এ চক্রটিকে একটি বার্তা দিতে চান সংশ্নিষ্টরা।
উঠতি মডেলদের যারা ব্যবহার করতেন, পার্টি আয়োজনের জন্য তাদের বিভিন্ন ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রতি রাতে সেখানে পার্টির আয়োজন করা হয়। সেখানে চড়া দামে বিত্তশালীদের কাছে বিদেশি মদও বিক্রি করে আয় করা হয় লাখ লাখ টাকা। আবার সরকারি-বেসরকারি কাজ বাগিয়ে নিতে কেউ কেউ উঠতি মডেল ও নায়িকাদের ব্যবহার করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে আরো জানান, অসতর্ক অবস্থায় তোলা ছবি ও ভিডিও পুঁজি করে অনেক বিতর্কিত মডেল ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে মাসোহারা নিতেন। কেউ কেউ দামি গাড়ি নিয়েছেন। অনেককে বিদেশ ভ্রমণের পুরো খরচও দেওয়া হয়। মূলত বিতর্কিত মডেলদের মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসে যাদের অসতর্ক মুহূর্তের ভিডিও রয়েছে, তা জব্দ করা হবে। আরও কয়েকজন মডেল গ্রেপ্তারের তালিকায় রয়েছেন।



