মানচিত্র প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক মেডিকেল ফিজিক্স সংস্থা (IOMP) বাংলাদেশী বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. গোলাম জাকারিয়াকে ২০২৫ সালের হ্যারল্ড জোন্স মেডেল প্রদান করছে। এটি মেডিকেল ফিজিক্সের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ড. গোলাম আবু জাকারিয়া বাংলাদেশী বংশদ্ভূত জার্মান প্রবাসী একজন বিশ্ববিখ্যাত মেডিকেল ফিজিসিস্ট। তিনি রেডিয়েশন অনকোলজি, নিউক্লিয়ার মেডিসিন এবং ডায়াগনস্টিক রেডিওলজিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এর আগে ২০২৩ সালে তিনি জার্মান সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘ফেডারেল ক্রস অব মেরিট’ লাভ করেছেন।
প্রথম জার্মান বিজয়ী: একজন সহকর্মী IOMP-এর ওয়েবসাইটে এই সংবাদটি দেখে সঙ্গে সঙ্গে অধ্যাপক জাকারিয়াকে জানিয়ে দেন। এরপর IOMP-এর প্রেসিডেন্ট নিজে অধ্যাপক জাকারিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি অক্টোবরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ প্রদেশের শহর অ্যাডিলেইডে পাঁচ দিনব্যাপী ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অন মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সম্মেলনে প্রদান করা হবে। এই সম্মেলনটি প্রতি তিন বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, ড. জাকারিয়া এই পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম জার্মান অধিবাসী।
IOMP-এর এই সম্মাননার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানজগত জার্মান প্রবাসী এই বাসিন্দার বহুমুখী ও নিরলস অবদানের স্বীকৃতি দিচ্ছে। ছয় বছর আগে অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি জার্মানির কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুমারসবাখ প্রশিক্ষণ হাসপাতালে চিকিৎসা পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জার্মান সোসাইটি ফর মেডিকেল ফিজিক্স (DGMP) তাদের দীর্ঘদিনের সদস্য প্রফেসর জাকারিয়াকে নিজেদের ওয়েবসাইটে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন: “এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মাধ্যমে তার অসাধারণ অবদান - বিশেষ করে গবেষণা, ক্লিনিক্যাল উদ্ভাবন এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে সম্মানিত করা হয়েছে।” তারা আরও জানায়, জাকারিয়া তার দূরদর্শী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মানব উন্নয়নে কাজ করেছেন “আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উন্নয়ন, বাংলাদেশের একাডেমিক কাঠামোর প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন দেশে তরুণ প্রতিভাদের সহায়তার মাধ্যমে”।
বর্তমানে ৭২ বছর বয়সী এই অধ্যাপক মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাংলাদেশ ছেড়ে জার্মানিতে আসেন। শুরু থেকেই তিনি বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, তরুণ চিকিৎসা পদার্থবিদদের প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষায় সহায়তার প্রতি নিবেদিত ছিলেন। তিনি বহু তরুণ চিকিৎসা পদার্থবিদদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন, যার মাধ্যমে তারা জার্মানিতে এসে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছে। ৩০ বছরেরও বেশি আগে তিনি ডিজিএমপি’র আওতায় ‘মেডিকেল ফিজিক্স ইন ডেভেলপিং কান্ট্রিজ’ বিষয়ক একটি কমিটি গঠন করেন।
হ্যারল্ড জোন্স মেডেলটি নিঃসন্দেহে এক বিশেষ মর্যাদার প্রতীক, তবে এটি তার প্রথম পুরস্কার নয়। দুটি খ্যাতনামা অনকোলজি সংস্থা তাকে ‘Outstanding Personality of the Decade 2000-2010’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল তাঁকে “Global Radiation Oncology Distinguished Leader Award 2019” প্রদান করেছে- কেবল কয়েকটি উদাহরণ হিসেবে। বাংলাদেশে তার চিকিৎসা ও উন্নয়ন সহায়তামূলক কাজ এবং জার্মান-বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের স্বীকৃতি হিসেবে জার্মান সরকার তাঁকে ‘ফেডারেল ক্রস অব মেরিট’ পুরুস্কার প্রদান করেছে।
ড. জাকারিয়া বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছে এমন অনেক ছাত্র’র তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সেন্টার ফর মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড ক্যান্সার রিসার্চ-এর উন্নয়নেও কাজ করে যাচ্ছেন। প্রফেসর জাকারিয়া গণমাধ্যমের সাথে আলাপের সময় বলেন, ‘গত বছরও ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে একটি বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম; কিন্তু আমি না করে দিয়েছিলাম। এতদূর যেতে ইচ্ছা করেনি। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘কিন্তু এবার তো যেতেই হবে!’ এখন তাঁর সামনে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠেয় পুরস্কার বিতরণী, যা তাঁর সারা জীবনের অবদানের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।” চমৎকার শিক্ষাদানে তাঁর অঙ্গীকার ও চিকিৎসা পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে অবদান তাঁকে এই ক্ষেত্রে একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিতে পরিণত করেছে বলে জার্মান সোসাইটি ফর মেডিকেল ফিজিক্স (ডিজিএমপি) তাদের বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে।
ড. গোলাম আবু জাকারিয়ার জীবন ও কর্ম
ড. জাকারিয়া ১৯৫৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নওগাঁয় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়াকালীন ১৯৭২ সালে জার্মান সরকারের বৃত্তি নিয়ে জার্মানিতে যান। ১৯৭৮ সালে মার্টিন লুথার ইউনিভার্সিটি অব হালে-ভিটেনবার্গ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব গটিনজেন থেকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করেন। হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডিস্টিংশনসহ পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে মেডিকেল ফিজিক্সে রেসিডেন্সি সম্পন্ন করেন। তাঁর ডক্টরাল থিসিসে তিনি মাথা, ঘাড় এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ‘পেন্সিল বিম’ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এই প্রোগ্রামটি হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে বাণিজ্যিক ট্রিটমেন্ট প্ল্যানিংয়ে আসার আগ পর্যন্ত প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হয়েছিল।
পেশাগতভাবে তিনি ৩০ বছরেরও বেশি সময় ইউনিভার্সিটি অব কোলোনের গুমারসবাখ একাডেমিক টিচিং হাসপাতালের মেডিকেল রেডিয়েশন ফিজিক্স বিভাগের প্রধান এবং চিফ মেডিকেল ফিজিসিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ে তিনি ডোসিমেট্রি, রেডিওথেরাপি প্ল্যানিং এবং কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্সের মতো ক্ষেত্রগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি সাধন করেন। ২০০৩ সাল থেকে তিনি আনহাল্ট ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের ক্লিনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করছেন।
প্রফেসর জাকারিয়া বাংলাদেশে মেডিকেল ফিজিক্স শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ২০০০ সালে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু করে তিনি এই যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি সাউথ এশিয়ান সেন্টার ফর মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড ক্যান্সার রিসার্চ (SCMPCR) প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে আলো-ভুবন ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা। এই প্রতিষ্ঠান সারাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণখাতে নিরলসভাবে কাজ করছে। তাঁর লালন করা স্বপ্নের বাস্তবায়নে গুণগত শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই প্রতিষ্ঠান অঙ্গীকারাবদ্ধ।
ড. জাকারিয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পদে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: DGMP-এর ডেভলপিং কান্ট্রিস বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ার। (IMPCB)-এর অ্যাক্রেডিটেশন কমিটির ভাইস-চেয়ার। ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল ফিজিক্স সার্টিফিকেশন বোর্ড EFOMP-এর অ্যাক্রেডিটেশন কমিটি ২ (রেডিয়েশন ফিজিক্স)-এর চেয়ার। DGMP-এর এআই বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং ICTP-এর ট্রেনিং প্রোগ্রামের প্রশিক্ষক। একজন সফল গবেষক হিসেবে তাঁর ১২০টিরও বেশি প্রকাশনা রয়েছে। তিনি রেডিওথেরাপিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) প্রয়োগ নিয়েও গবেষণা করেছেন।
তাঁর অবদানের জন্য তিনি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন, যেমন- DGMP এবং IOMP ফেলোশিপ। হার্ভার্ড গ্লোবাল রেডিয়েশন অনকোলজি ডিস্টিংগুইশড লিডার অ্যাওয়ার্ড। অর্ডার অব মেরিট অব দ্য ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি। তরুণ পেশাদারদের অনুপ্রাণিত করার জন্য AFOMP তাঁর নামে একটি লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডও চালু করেছে।


