ঢাকা, বাংলাদেশ  |  বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬



  বিভাগ : ব্যক্তিত্ব তারিখ : ১৩-০৬-২০২১  


নিভৃতচারী একজন মুক্তিযোদ্ধার অজানা কাহিনি


  কামরুল ইসলাম



উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই

কামরুল ইসলাম: সনদধারী অনেক মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের কাহিনি আমরা বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় পড়েছি। আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বলছি। যা কিনা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু হয়ে সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়েছিল। আমরা পেয়েছিলাম একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। স্বাধীনতা আন্দোলন কিন্তু শুরু হয়েছিল আরো অনেক আগে। গবেষকদের মতে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সাথে সাথেই। ভাষা আন্দোলনকালে আমার জন্ম হয়নি। তাই এ সম্পর্কিত তথ্য ও ইতিহাস ঘেটে আর শুনে জানতে হয়েছে, শিখতে হয়েছে। যেহেতু আমি নিজে তখন ভাষা আন্দোলন দেখিনি বা সরাসরি পত্রপত্রিকায় পড়িনি, তাই পরবর্তীতে নিজ জ্ঞানে পর্যালোচনা করে এ আন্দোলনসম্পর্কিত তথ্য যাচাই বাছাই করেছি বা করার চেষ্টা করেছি। আমাদের ইতিহাসবিদ, গবেষক, পিতা-মাতা ও সর্বপরি শিক্ষকরা এ ব্যাপারে ভালো মন্দ বা পক্ষে বিপক্ষে তথ্য ও মতামত দিয়েছেন। একথা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে এ আন্দোলনের বিপক্ষে আমি অন্ততপক্ষে কাউকে পাইনি। সবাই একমত যে আমাদের মাতৃভাষা, বাংলাকে ধরা থেকে মুছে দেয়ার যে কালো নকশা করা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়া ব্যতীত কোন বিকল্প ছিলনা। আন্দোলনের রূপ বা কারা এর নেতৃত্ব দিয়েছে, কারা আসলে সরাসরি আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন সে বিষয়ে কিছুটা বিতর্ক ছিল। তবে কালের বিবর্তনে সে বিতর্ক হালকা হয়ে সকালের সূর্যালোকে মুছে যাওয়া কুয়াশার মত উবে গেছে। এখন আর নতুন নতুন শহীদের নাম আসেনা বা নেতৃত্বের দাবী নিয়ে বিরোধও প্রকাশ পাচ্ছে না। হয়তোবা পরবর্তীতে ঘটা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিতর্কগুলো সে স্থান দখল করে নিয়েছে। সেটাই ইতিহাসের নিয়ম। নতুন পুরানোকে ফেলে এগিয়ে যায়। কথায় আছে সময়ে শুকোয় পুরানো ঘা।

ইতিহাসবিদরা বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র সংগ্রামের পর্যালোচনা করে দেখেছেন পক্ষের লোকদের ভেতরেও বিপক্ষের লোক ছিল আবার বিপক্ষের মাঝেও পক্ষের লোক ছিল। অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি বিনা অস্ত্রে মুক্তিযুদ্ধ যে করা যায় বা তার প্রয়োজনীয়তা যে অপরিহার্য সেটাও ইতিহাসবিদরা বলে গেছেন। ১৯৭১ সালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে যোগদান না করলেও তার আগে পরের ইতিহাস নিজ চোখে কিছুটা হলেও দেখেছি এবং শুনেছি। আমার নানা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বাবা এবং মা’র পরিবারের দিক থেকে বয়স্ক অনেকেই সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। বিনা অস্ত্রে আবার অনেকে পরোক্ষভাবে অন্য ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছেন।

এখন বিনা অস্ত্রে যুদ্ধ করা এমনি এক নিভৃতচারী মুক্তিযোদ্ধার কথা পাঠকদের শোনাবো। ১৯৭১ সালে সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামের উত্তরপাশে পলাশপোল নিবাসী আবুল হোসেন নিজ পরিবার নিয়ে বাস করতেন। যেহেতু তিনি সরকারী চাকরিজীবি ছিলেন, সেজন্য প্রতিদিন তাঁকে অফিসে হাজিরা দিতে হতো। সে সময় দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা কারণে যাত্রিবাহী বাস নিয়মিত চলতো না। তাই অগত্যা তিনি প্রতিদিন সকালে প্রায় চল্লিশ মাইল সাইকেল চালিয়ে সাতক্ষীরা থেকে খুলনায় গিয়ে অফিস করতেন। অফিসশেষে আবার এই চল্লিশ মাইল সাইকেল পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরতেন। খুলনা থেকে সাতক্ষীরা এ রাস্তাটুকু তখন ছিল ভয়াবহ। বিভিন্ন সড়ক-পুলের গোড়ায় পাহারায় ছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। বাজারে বাজারে ঘুরতো তাদের সহচর রাজাকার আর আলবদর। খুলনা সড়কের পাশে কিছু কিছু এলাকায় ছিল বিহারীদের আবাস। হিন্দুদের আবাসও কম ছিলনা। কিন্তু সে আবাসগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকেই। আবুল হোসেন সাইকেলে পথ চলার পাশাপাশি সে তান্ডব প্রত্যক্ষ করেছেন বহুবার।

একবার সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় লক্ষ্য করলেন এক পুলের পাশে গাছে ঝোলানো কয়েকটি লাশ থেকে তখনো রক্ত ঝরছে। দেখলেন একজন তখনো নড়াচড়া করছে। অর্থাৎ ওদেরকে গুলি করা হয়েছিল কিছুক্ষণ আগেই। নিরীহ মানুষদের প্রতি এসব অন্যায়-অত্যাচার দেখে রাগে ক্ষোভে তাঁর রক্ত টগবগ করে ফুটতো। ইচ্ছা হতো এদেরকে চরমভাবে শাস্তি দিতে। সব ফেলে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিতে। কিন্তু তিনি জানতেন এটা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ ছয় সন্তানের জনক তিনি। সবার বড় ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র। পাঁচ মেয়ের মাঝে বড় দুজনের তখন উঠতি বয়স। ঘরে স্ত্রী, বৃদ্ধা মা, সবাই যে তাঁর উপর নির্ভরশীল। পরিবারের অসহায়ত্ব এবং নিরাপত্তার কথা ভেবে হার মানলেন তিনি। তবে অসীম সাহসী, অদম্য পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী আবুল হোসেন কিন্তু দমে যাবার প্রাত্র নন। তিনি শুরু করলেন অন্য এক যুদ্ধ, অন্য এক প্রাঙ্গনে, ভিন্ন আঙ্গিকে। অস্ত্রের পরিবর্তে হাতে তুলে নিলেন কলম। কারণ তিনি জানতেন অসির চেয়ে মসির শক্তি বেশি!

আবুল হোসেন দেশী বিদেশী পত্র পত্রিকা ও ম্যাগাজিন পড়তেন প্রচুর। স্কুলপড়ুয়া ছেলেরও নেশা ছিল বই পড়ার। পাঠাগারে যাতায়াত ছিল দুজনের বিস্তর। দেশ-বিদেশ, ভূগোল, রাজনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে অগাধ জ্ঞান ছিল তার। ইংরজিতেও দক্ষতা ছিল প্রচুর। এবার সেটাকে তিনি কাজে লাগালেন। তাঁর স্বচক্ষে দেখা অত্যাচার, খুন আর নিরীহ মানুষের উপর চালানো নিপীড়নের কথা, তথা বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার আর স্বাধীনতার কথা, বিদেশী পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন আর রাষ্ট্রদূতদের কাছে, টি. ব্রাউন (T. Brown) ছদ্মনামে চিঠি লিখে জানাতে শুরু করলেন। প্রতিদিন যা দেখতেন তা মাথায় যতটুকু সম্ভব টুকে রাখতেন। লিখিত নোট রাখার ভয় ছিল। পাছে সেগুলো ধরা পড়ে যায়! প্রমাণ রাখতে চাননি। প্রতিদিন অফিসে এসে সরকারী নথিপত্র টাইপের পাশাপাশি ভয়ানক খবরগুলো ইংরেজিতে টাইপ করে ফেলতেন। লাগতো প্রচুর সময়। কাজের মাঝে সুযোগ বুঝে সময় নিয়ে টাইপ করতে হতো। আমাদের গল্পছলে বলেছেন, কখনো কখনো পাশে বসা বাঙালি বা বিহারিদের কেউ দেখে ফেলে বা জেনে যায় সে ভয়ে তিনি অস্থির থাকতেন। টাইপ করা কাগজ কখনো মোজার ভেতরে করে কখনো গেঞ্জির ভেতরে করে লুকিয়ে বাসায় এনে কলম দিয়ে সংশোধন করতেন। সম্ভব না নতুন করে আবার টাইপ করার। তাতে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আরো বেশি। সে সময়ে অফিসে কাকে বিশ্বাস করা যায়, আর কাকে করা যায়না সেটা বলা ছিল অসম্ভব। তাই প্রয়োজন থাকলেও কারো সাহায্য নিতে পারেন নি।

সেকালে চিঠি ফেলার জন্য রাস্তার পাশে সিমেন্টের ঢালাই করা পাটাতনের উপর গোলাকার হলুদ রঙ্গের চিঠির বক্স থাকতো। সে চিঠির বক্সে খামেভরা চিঠিগুলো ফেলার কাহিনি সবিস্তারে বলেছেন আমাদের। অফিসের কাছাকাছি কোন বক্সে খামগুলো ফেলতেন না। আবার একই বক্সে দুবার চিঠির খাম ফেলতেন না। ভয় ছিল, পোস্ট অফিসে বিদেশি ঠিকানায় চিঠি যাচ্ছে দেখে, গোয়েন্দাদের খবর দিলে তারা হয়তো চিঠি খুলে পুরো খুলনা এলাকায় নজরদারী করতে পারে। কোন বক্স থেকে এবং কে চিঠি পোস্ট করছে। অনেকসময় যাতায়াতের পথে ভেতরের রাস্তায় থাকা কোন বক্সেও চিঠি ফেলেছেন। চিঠি ফেলার সময় অধিক সতর্ক থাকতে হতো, যাতে তাঁকে কেউ না দেখে ফেলে। কারণ চিঠিসহ ধরা পড়লে মৃত্যু অবধারিত। সেইসাথে তাঁর পরিবারের ভাগ্যে ঘটবে ভয়াবহ পরিণতি। হাতের লেখা যাতে ধরা না পড়ে তাই তিনি বুদ্ধি করে খামের উপরের ঠিকানাও টাইপ করতেন। বিষয়টা এতটাই গোপনীয় রাখতেন যে স্ত্রী বা মেয়েদেরও জানতে দেননি। পাছে তারা ভয়ে তাঁকে এ কাজ করতে নিষেধ করে। স্বাধীনতার পর তারা সব জানতে পেরে শিহরিত হয়েছেন।

আবুল হোসেন আমার শ্বশুর হওয়ায় তাঁকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে শুনেছি প্রত্যক্ষ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। বলেছেন তাঁর অলিখিত যুদ্ধের কথা, পরোক্ষ- তবে বিশেষায়িত যুদ্ধ। কখনো চাননি প্রকাশ হোক তাঁর নাম, প্রকাশিত হোক যুদ্ধে তাঁর পরোক্ষ অংশগ্রহণের কথা। কী এক অজানা কারণে মনে ছিল বিস্তর ক্ষোভ। মনে মনে ঘৃনা করতেন মুক্তিযুদ্ধের নাম ভাঙিয়ে হাতানো সুযোগ নেয়া ও পাওয়াকে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে তাঁর অবদানের বিন্দুমাত্র প্রতিদান চাইতেননা কখনো। এ জন্য হয়তো তাঁর স্ত্রী আর সন্তান ছাড়া কেউ কখনো জানতে পারেনি যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিয়ে, টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করার কথা।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবুল হোসেন টি. ব্রাউন (T. Brown) নামে তৎকালীন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসে চিঠি পাঠাতেন। যাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, নীচে তাদের অনেকের নাম ও পদবী দেয়া হলোঃ

১. আমেরিকান রাষ্ট্রদূত

২. ফ্র্যান্স রাষ্ট্রদূত

৩. পোল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত

৪. পশ্চিম জার্মানির রাষ্ট্রদূত

৫. অস্ট্রেলিয়ান রাষ্ট্রদূত

৬. জাপানের রাষ্ট্রদূত

৭. কানাডার রাষ্ট্রদূত

৮. ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রদূত

৯. সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত

১০. পূর্ব জার্মানির রাষ্ট্রদূত

১১. চীনের রাষ্ট্রদূত

১২. সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত

১৩. গ্রেট ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত

 উপরোক্ত ঠিকানাগুলো বাদে আবুল হোসেন হংকং-এ অবস্থিত তৎকালীন Peace Book Company –র কর্মকর্তা Mr. K. Y. Luk- এর নিকট বিভিন্ন সময়ে অনেক সংবাদ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তাঁর বড় ছেলে আখতার হোসেন কমলের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি ১৯৭০-৭১ সালে হংকংএ অবস্থিত একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডাকযোগে প্রতিনিয়ত ম্যাগাজিন আনাতেন। সেখান থেকেই আবুল হোসেন Peace Book Company-র কর্মকর্তা Mr. K. Y. Luk-এর ঠিকানা পেয়ে তার সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। স্বাধীনতার বহু পরে আবুল হোসেন নিজে উদ্যোগে চেষ্টা করেছিলেন Mr. K. Y. Luk-এর সাথে যোগাযোগ করার জন্য। কিন্তু সে চেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়। আমি ২০২০ সালে ইন্টারনেটে সার্চ করে শুধুমাত্র নিচের তথ্যটি পাই। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সেই Peace Book Company –টি।

 

১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফটোকপি করার মেসিন পর্যাপ্ত ছিলনা। প্রয়োজনে কার্বন কাগজ ব্যবহার করে চিঠির কপি রাখা হতো। আবুল হোসেনের জন্য সেটাও ছিল বিপজ্জনক। তথাপি তিনি কিছু চিঠির কপি রেখেছিলেন। সেগুলোর কিছু নষ্ট হয়ে গেছে সময়ের বিবর্তনে। তার থেকে কিছু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

নিচের এ চিঠিটি তিনি খুলনা থেকে লিখেছেন ১৯৭১ সালের ৬ জুলাই Peace Book Company-র কর্মকর্তা Mr. K. Y. Luk- এর কাছে। চিঠিতে তিনি তাঁর ছেলের কথা লিখেছেন। এই চিঠিতে তিনি আরো লিখেছেন, ‘এই দেশের আসল পরিস্থিতি জানতে আপনার আগ্রহের জন্য আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তবে আমি কি বলবো মাননীয় সম্পাদক, এটি একটি করুণ ও হৃদয়বিদারক ইতিহাস- যা মানবজাতি আগে কখনো দেখেনি।’

 

ওপরের চিঠিতে আবুল হোসেন নিজ নাম প্রকাশ না করার কারণ জানিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন পত্র প্রাপকের কাছে। চিঠিটি তিনি Peace Book Company-র কর্মকর্তা Mr. K. Y. Luk-এর নিকট লিখেছেন এবং তাকে অনুরোধ করেছেন স্থানীয় প্রকাশক বা মিডিয়াতে পাঠাবার জন্য যাতে করে তারা উপরোক্ত সংবাদ প্রকাশ করতে পারে। তিনি দ্বিতীয় পাতায় লিখেছেন, ‘সংক্ষেপে বাংলাদেশের এই অবস্থা। যদি বর্তমানহারে নিরবচ্ছিন্নভাবে হত্যাকান্ড অব্যাহত থাকে তবে অদূর ভবিষ্যতে বাঙালি জাতি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

 

পাকিস্তানে আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের কাছে লেখা উপরের চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রদূত, আপনার সরকারের আসল নীতি কি তা আমরা বুঝতে সত্যিই অক্ষম। আপনারা বলছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আপনারা ভিয়েতনামে গেছেন তবে এখানে, পূর্ববঙ্গে আপনারা একটি বর্বর সরকারের পক্ষে গণতন্ত্রের শ্বাসরোধে সহায়তা করছেন। আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক উভয় সংসদীয় আসনের প্রায় সব আসন জিতেছিল কিন্তু সেই দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশজুড়ে দলের সমর্থক, হিন্দু ও ছাত্রদের হত্যা করা হচ্ছে। আপনার দেশ সে সরকারকে সহায়তা করছে।‘

 

ওপরের চিঠিতে আবুল হোসেন সাংকেতিক এস ও এস লিখেছেন পত্র প্রাপকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। যাতে করে তারা এ সংবাদকে গুরুত্ব দিয়ে পড়েন। এখানে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার জন্যও অনুরোধ জানিয়েছেন গ্রেট ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতকে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ভিতর দিয়ে যাঁরা গেছেন অথবা সেই যুদ্ধ সম্পর্কে কিয়দংশ অবহিত তারা সহজেই অনুমান করতে পারবেন সেই পরিস্থিতিতে এই চিঠিগুলো ছিল কি ভয়াবহ। আর চিঠিসহ প্রেরক ধরা পড়লে তার ভাগ্যে কী ঘটতো সেটাও সহজেই অনুমেয়।

জীবনে চলার পথে বহু মানুষের সাথে আমার পরিচিতি ঘটেছে। তবে তাঁর মত এমন সৎ, নিরহংকারী ও পরোপকারী মানুষ খুব কমই দেখেছি। ১৯৮৪ সালে জেলা পরিসংখ্যান অফিসার হিসাবে চাকরি থেকে অবসর নেন তিনি। চাকরিরত অবস্থায় অফিসের সহকর্মী থেকে পিয়ন পর্যন্ত, সবার সাথে তাঁর ব্যবহারের কোন পার্থক্য ছিলনা। তাঁর ভিতর কোন শ্রেণিবৈষম্য ছিলনা। যে দিন বাড়িতে কামলা খাটতো তিনি তাদের মজুরি মিটিয়ে দুপুরের খাবার খেতেন। প্রচন্ড বিদ্যানুরাগী ছিলেন তিনি। সবাইকে পড়াশোনার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। অর্থাভাবে যাদের পড়াশোনা হচ্ছেনা এমন গরীব ছাত্রছাত্রীকে তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করতেন। তবে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর উৎসাহ ছিল বেশি। কারণ তিনি সবসময় চাইতেন মেয়েরা যেন স্বাবলম্বী হয়। নিজের পরিচয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। ভীষণ সংস্কৃতমনা ছিলেন। গান খুব ভালোবাসতেন। গানের গলাও ছিল অসম্ভব সুন্দর। বহু গুনে ভূষিত আর বৈচিত্র্যময় জীবনের এই মানুষটির স্বভাব ছিল একেবারে শিশুশুলভ। ছোটদের সাথে অবাধে মিশে যেতে পারতেন। আর সেজন্য নাতি-নাতনিদের কাছে ছিলেন অতি প্রিয়পাত্র। সবার প্রিয় এ মানুষটি আমাদের সবাইকে ছেড়ে ২০২০ সালের ৮ মার্চ পাড়ি দিয়েছেন অন্য এক গন্তব্যে। তাঁর জীবনের অধ্যায় এখানেই শেষ। তবে আমরা যারা বেঁচে আছি তাঁর আপনজন, আমাদের স্মৃতিতে তাঁর রেখে যাওয়া কর্মকান্ড, আদর্শ, দর্শন চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

 খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ১৯৭১ এর যুদ্ধে তাঁর মত যারা দেশের জন্য নিরবে, নিভৃতে কাজ করেছেন এমন নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। তাঁদের মাঝে কেউ কেউ হয়তো বেঁচে আছেন। কেউবা হয়তো এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন সবার অগোচরে।

 স্বাধীনতার ৫০ বৎসরলগ্নে স্মরণ করছি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের, গত হওয়া এবং জীবিত সকল মুক্তিযোদ্ধাকে। বাংলাদেশের জনগণকেও জানাচ্ছি শুভেচ্ছা, যারা বিভিন্নবভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধ ও সংগ্রামে অবদান রেখেছেন।

কামরুল ইসলাম, মার্চ ২০২১।

স্টকহোম, সুইডেন


 নিউজটি পড়া হয়েছে ১০৯৩ বার  






 

ব্যক্তিত্ব

 
আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও আলো ভুবন ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাকারিয়া

ব্যক্তিত্ব বিভাগের আরো খবর






 

আমাদের  মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
ঢাকা: পল্টন রিসোর্সফুল সিটি, ৫১/এ পুরানা পল্টন (৪র্থ তলা), ঢাকা-১০০০।
নারায়ণগঞ্জ: ৪৫/৩ মতিন ভিলা, হাজী ব্রাদার্স রোড, জামতলা, নারায়ণগঞ্জ।

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০

 


সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক
আসিফ হাসান নবী

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

 


President of the Editorial Board
Abdullah Al-Harun
Chief Editor
Asif Hasan Nabi

Editor & Publisher
Md. Ziaul Haque
Special Correspondent
Robiul Islam Sohel

  Location Map
Copyright © 2012-2026

All rights reserved

concept, design
& developed by

corporate work
 

  info@amadermanchitra.news       amadermanchitrabd@gmail.com